গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস-সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করার দাবিতে লংমার্চ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার থেকে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় পর্যায়ের লংমার্চ। প্রথমটা ছিল ঢাকা টু চট্রগ্রাম। এবার ঢাকা টু রংপুর। এই লংমার্চে আসলে কার ক্ষতি হচ্ছে আর কার লাভ হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতেই এই প্রতিবেদন।
রাজনীতিতে লংমার্চ বা দীর্ঘযাত্রার মতো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি সবসময়ই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
কার ক্ষতি?
সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ী: যেকোনো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। লংমার্চের কারণে দূরপাল্লার যান চলাচল ব্যাহত হওয়া, রাস্তাঘাট বন্ধ থাকা এবং যানজটের ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার শঙ্কা থাকে।
অর্থনীতি ও দৈনিক আয়ের মানুষ: দিনমজুর, রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিকদের মতো দৈনিক আয়ের মানুষের উপার্জন বন্ধ বা সীমিত হয়ে যায়। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উৎপাদন ব্যাহত হয়।
আইনশৃঙ্খলা ও জানমাল: রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অনেক সময় সহিংসতা, ভাঙচুর বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়।
কার লাভ?
বিরোধী দল (আন্দোলনকারী): লংমার্চ সফল হলে বিরোধী দল তাদের রাজনৈতিক শক্তি ও জনসমর্থন প্রদর্শন করতে পারে। কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয় এবং দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত হয়। এছাড়া সরকারের ওপর দাবি আদায়ের জন্য বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়।
রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ: এই ধরনের বড় কর্মসূচির মাধ্যমে সমমনা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধতা আরও জোরালো হতে পারে, যা ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে সাহায্য করে।
সরকারের অবস্থানচ্যালেঞ্জ ও কৌশল: সরকারের জন্য এটি একই সাথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক কৌশল প্রদর্শনের সুযোগ। সরকার যদি এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে তা সুশাসনের প্রতীক হিসেবে প্রচার করার সুযোগ পায়। আবার অপরিকল্পিত বাধা বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটলে তা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে পারে।
লংমার্চের অর্থনৈতিক প্রভাব
উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয় : লংমার্চের কারণে মহাসড়কগুলো বন্ধ বা অবরুদ্ধ থাকলে পণ্যবাহী ট্রাক ও লরি চলাচল করতে পারে না। ফলে বন্দর থেকে কাঁচামাল কারখানায় এবং কারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হয়।
রপ্তানি খাতে আঘাত: বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) খাতের মতো সময়ের ওপর নির্ভরশীল শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়মতো পণ্য শিপমেন্ট করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের ক্যান্সিলেশন বা ডিসকাউন্টের মুখে পড়তে হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দৈনিক আয়ের মানুষ ও অনানুষ্ঠানিক খাত
উপার্জন বন্ধ: রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, হকার এবং ছোট দোকানদারদের মতো দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষরা সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। একদিন কাজ বন্ধ থাকার অর্থ তাদের পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তায় টান পড়া।
ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষতি: খুচরা বিক্রেতা ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের দৈনিক বিক্রি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, যার ফলে তারা পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন।
মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি
কৃত্রিম সংকট: মহাসড়ক অবরুদ্ধ থাকার কারণে ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে ঢাকার বাইরে থেকে শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য পচনশীল পণ্য আসতে পারে না। সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম একরাতেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
কৃষকদের লোকসান: অন্যদিকে, ঢাকার বাইরে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য শহরে পাঠাতে না পেরে পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হন কিংবা পণ্য পচে নষ্ট হয়। এতে প্রান্তিক কৃষকেরা সরাসরি পুঁজিশূন্য হয়ে পড়েন।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা
বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট: ঘনঘন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লংমার্চের মতো কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) আসার পথ রুদ্ধ করে। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল পরিবেশ পছন্দ করেন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলে তারা মূলধন বিনিয়োগে দ্বিধাবোধ করেন।
ঘরোয়া ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত: দেশের ভেতরের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নতুন প্রকল্প বা ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রাখে।
জাতীয় রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষতি
রাজস্ব আদায় হ্রাস: ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির থাকলে সরকারের ভ্যাট (VAT) এবং শুল্ক আদায় মারাত্মকভাবে কমে যায়।
ব্যাংকিং লেনদেনে ধীরগতি: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে লেনদেন ও ঋণ প্রবাহ সচল থাকে না, যা পুরো আর্থিক খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে লংমার্চ কার্যকর হলেও, অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা এবং বিকল্প শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির চর্চা করা জরুরি।
পড়ুন : জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করলে লং মার্চের প্রয়োজন হতো না : ডা. শফিকুর রহমান


