জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গী হচ্ছেন ৩৫ জন। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব জানান, সফরসঙ্গীদের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকছেন। অন্যদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও নিউইয়র্কের স্থায়ী প্রতিনিধি সেখান থেকেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগ দেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এ ছাড়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি গোলাম মহিউদ্দিন ইকরামও সফরসঙ্গী হিসেবে যাচ্ছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান নিউইয়র্ক থেকেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগ দেবেন।
আগামী সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। এ সফরে তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।
সানফ্রান্সিসকোতে প্রধানমন্ত্রী কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব জানান, সেখানে মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
প্রতিনিধিদলের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সচিব বলেন, ‘নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আপনারা জানেন যে সফররত প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বের ওপরও বর্তায়।
সুতরাং আমরা যুক্তরাষ্ট্রের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মধ্যে রয়েছি, যাতে সকলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।’
পররাষ্ট্র সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশেষ কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকারের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। এর মাধ্যমে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
এবারই প্রথম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। একই অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
আসাদ আলম সিয়াম বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, মানবিক সংকট ও ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে আন্তর্জাতিক শান্তি ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে জানান তিনি।
নিউইয়র্কে পৌঁছে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। ওই দিন সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য দেওয়া স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন তিনি। এরপর অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের আয়োজনে বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক একটি সভায় বক্তব্য দেবেন। বিকেলে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেবেন।
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এসব আয়োজনে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি ও জলবায়ু ন্যায্যতার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি।
একই দিন বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের আয়োজনে দুটি সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক সাইড ইভেন্টে দ্রুততম সময়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন তিনি। পরদিন মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
সফরের সময় কয়েকটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক উল্লেখযোগ্য। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট, মেটাসহ আরও কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
পররাষ্ট্র সচিবের মতে, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন সরকারের নতুন যাত্রাকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
পড়ুন : অপ্রতিম হত্যার বিচার চেয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
সা/


