দেশে রিজার্ভ ৩৬.৩১ বিলিয়ন ডলার, বাড়ছে রেমিট্যান্সও

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩৬ দশমিক ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

বিজ্ঞাপন

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলেও দেশের বহিঃখাতের স্থিতিশীলতার চিত্র রিজার্ভের বর্তমান অবস্থায় প্রতিফলিত হচ্ছে।

এদিকে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহও বেড়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে প্রবাসীরা দেশে ১৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। ১ ডলার ১২২ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

গত বছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮০ লাখ ডলার বা প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।

শুধু ১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর—এই তিন দিনে দেশে এসেছে ১৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স। ১ ডলার ১২২ টাকা হিসাবে যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৭৭০ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৯৩ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, গত অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৬৭৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা প্রায় ৮২ হাজার ৫৮২ কোটি টাকার সমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস ১৯ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৯৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ১ ডলার ১২২ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

সামষ্টিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর একটি হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ। অর্থনৈতিক এমনকি রাজনৈতিক আলোচনাতেও ‘রিজার্ভ’ শব্দটির ব্যবহার প্রায়ই দেখা যায়। মূলত কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে থাকা ডলার, ইউরোসহ বিভিন্ন বিদেশি মুদ্রা, সোনা, রুপাসহ অন্যান্য সম্পদের সমষ্টিকেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বলা হয়।

কেন দরকার রিজার্ভ?

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কেনাকাটায় টাকার ব্যবহার হলেও আমদানি-রপ্তানির মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য টাকায় সম্পন্ন হয় না। এসব লেনদেনে ডলার, ইউরোসহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহৃত হয়। একইভাবে বিদেশি ঋণ ও রেমিট্যান্সও বিভিন্ন মুদ্রায় দেশে আসে। তবে বিশ্বব্যাপী মার্কিন ডলারের প্রভাব থাকায় অধিকাংশ বিদেশি মুদ্রাই ডলারে রূপান্তরিত হয়।

দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য রক্ষায় রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কীভাবে রিজার্ভ তৈরি হয়?

পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের রিজার্ভে যুক্ত হয়। একইভাবে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সও রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে অর্জিত অর্থ, বৈদেশিক ঋণ এবং অনুদানও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উৎস।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও রিজার্ভের পরিমাণ বাড়াতে বা কমাতে পারে।

কোথায় ও কীভাবে থাকে রিজার্ভ?

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি অংশ ডলারসহ হার্ড কারেন্সি হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত থাকে। এর পাশাপাশি পাউন্ড ও ইউরোর মতো আন্তর্জাতিক মুদ্রাও রাখা হয়। চীনা ইউয়ান, ভারতীয় রুপি ও রাশিয়ান রুবলের মতো মুদ্রারও কিছু অংশ থাকে।

রিজার্ভের একটি অংশ মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকেও রাখা আছে। ২০১৬ সালে সেখান থেকে সুইফট কোড হ্যাকিং করে ১০ কোটি ডলার চুরি হয়। এ ছাড়া রিজার্ভের অর্থ দিয়ে কেনা স্বর্ণও রয়েছে।

বিশ্বে বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের ইতিহাস

একসময় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ স্বর্ণকে আদর্শ সম্পদ হিসেবে মজুত করত। কারণ অর্থনৈতিক মহামন্দার সময়ও স্বর্ণ তার মূল্য ধরে রাখতে পারত।

১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের ব্রেটন উডস শহরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বাজারের মুদ্রাগুলোকে স্বর্ণ অথবা মার্কিন ডলারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সে সময় বিশ্বের মোট স্বর্ণের অর্ধেকই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।

পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মার্কিন ডলার থেকে স্বর্ণে রূপান্তরের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেন। এর ফলে মার্কিন ডলার পুরোপুরি একটি ফিয়াট কারেন্সিতে পরিণত হয়, যার মূল্য দেশটির সরকারের নীতির ওপর নির্ভরশীল। এ ঘটনাকে ‘নিক্সন শক’ বলা হয়।

এরপর আন্তর্জাতিকভাবে ডলারের আধিপত্য এবং বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই সময় থেকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে মার্কিন ডলারের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের শুরু

স্বাধীনতার পর অনেকটা শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তখন উল্লেখযোগ্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল না। প্রায় এক দশক বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কোনো তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় না।

সে সময় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় পাট, চাসহ হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য ছিল। বিপরীতে খাদ্য, ওষুধ, রাসায়নিক ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে হতো। প্রবাসী আয়ও তখন তেমন ছিল না।

স্বাধীনতার এক দশক পর ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল মাত্র ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার।

রিজার্ভ কীভাবে বাড়ে-কমে?

পণ্য ও সেবা রপ্তানি, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ, বিদেশি ঋণ-অনুদান এবং বিদেশে থাকা বিনিয়োগ থেকে অর্জিত অর্থ দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়, ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ এবং বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে রিজার্ভ থেকে অর্থ খরচ হয়।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মাসিক আমদানি কমানো হলেও এখনো তা রপ্তানি আয়ের তুলনায় বেশি। তবে গত অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে ২৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন।

প্রবাসী আয়ের এই প্রবৃদ্ধির ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে, যা বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

রিজার্ভ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ

বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় গত জুলাই মাসে ডলারের দর ১১৯ টাকা ৫০ পয়সায় নেমে আসে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনা শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যে প্রতি ডলারের দাম বেড়ে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণা, ডলারের দর কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে গত সাড়ে তিন মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ২১৩ কোটি ডলার কিনেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের কয়েকটি মাইলফলক

২০০৮ সালের জুনে দেশের রিজার্ভ ছিল ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের আগস্টে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

এরপর অবশ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। তিন বছরে রিজার্ভ কমে যাওয়ার পেছনে সে সময়ের সরকার বিশ্ববাজারে সার, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করে। নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য ছিল, বেশি দামে এসব পণ্য আমদানি করায় রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়।

তবে বিভিন্ন মহল বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের জন্য ব্যাপক অর্থপাচারের বিষয়টিও সামনে আনে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

কত পরিমাণ রিজার্ভ নিরাপদ?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের আমদানি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অর্থনীতির শক্তির একটি চিত্র পাওয়া যায়। এ কারণে সব দেশের সরকারই নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজার্ভ ধরে রাখার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের রিজার্ভ দ্রুত কমে যাওয়ার সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে আইএমএফ ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে। অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও বাজেট সহায়তা ও বিভিন্ন খাতে ঋণ দেয়, যা রিজার্ভের পতন ঠেকাতে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের এখন গ্রস রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার। তবে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য বা আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ দিয়ে দেশের সাড়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাকে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দীর্ঘদিন রিজার্ভ বাড়ার লাভ-ক্ষতি

রিজার্ভ বৃদ্ধি যেমন ইতিবাচক, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রিজার্ভ দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকলে তা অর্থনীতির ধীরগতিরও ইঙ্গিত দিতে পারে।

কারণ প্রবাসী আয়ের বিপরীতে বাজারে স্থানীয় মুদ্রা প্রবেশ করে। অতিরিক্ত রেমিট্যান্সের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। আবার পর্যাপ্ত আমদানি না হলেও রিজার্ভ বাড়তে পারে। এর প্রভাব ভোক্তার ভোগ ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে।

একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে গেলে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। কারণ এর ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে টান পড়তে পারে। এতে মানুষের আয় কমার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পড়ুন : বিপিসির লোকসান ও পাচার ঠেকাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন