সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সরকারি বাসা থেকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি ও ডায়েরির পাতা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব লেখায় বৈবাহিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রতারণার অভিযোগ এবং তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছে। চিঠিগুলোতে নিজেকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার বেদনার কথাও লিখেছেন মরিয়ম।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর এসব চিঠি ও ডায়েরির পাতা উদ্ধার করা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত চিঠিগুলো এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের লেখা বলে বলা হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া একটি চিঠিতে লেখা রয়েছে, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…. তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…’

অন্য একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’
আরেকটি চিঠিতে লেখা- ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী- কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউয়ের। আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারও স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!! কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের কারণ… ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেয়ার বিষয় নয়… ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের লোগোযুক্ত প্যাডে লেখা হয়েছে, ‘আমি হেরেছি— তুমি জিতেছো– কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি, ধংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি– ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’
চিঠিগুলোর সঙ্গে ‘১২-০৭-২০২৬’ তারিখ সংবলিত একটি পাতাও পাওয়া গেছে। ওই পাতায় ঘুমানোর আগে করণীয় কয়েকটি ধর্মীয় আমলের তালিকা লেখা রয়েছে।
চিরকুটগুলো দেখে কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’ লেখা-সংবলিত প্যাডে কালো কালির কলম দিয়ে লেখা একটি চিরকুটের কাগজের আকার তুলনামূলক ছোট। অন্য একটি চিরকুটে লাল কালি ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেটির হাতের লেখাও কিছুটা ভিন্ন বলে লক্ষ্য করা যায়। ওই কাগজটির আকারও বড় এবং সেটি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্যাড নয়; সাধারণ বাজারে পাওয়া যায় এমন এ-ফোর কাগজের মতো।

চিরকুটগুলোর কাগজ, কালি ও হাতের লেখায় এই পার্থক্য সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে—চিরকুটগুলো কি একই দিনে লেখা হয়েছিল, নাকি ভিন্ন কোনো দিনে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, লেখাগুলো কি মরিয়ম খাতুন নিজেই লিখেছিলেন, নাকি অন্য কারও হাতের লেখা?
এদিকে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে মরিয়ম খাতুনের মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। রোববার গভীর রাতে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও নজরুলের শ্যালক ওবায়দুল রহমানকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, মাকসুদা বেগম ও নজরুলের শ্যালক ওবায়দুল রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলায় বলা হয়, রোববার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল ইসলাম মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। খবর পেয়ে মরিয়মের বাবা তাঁর শ্যালিকা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তিনি বাসায় অনেক মানুষের ভিড় দেখতে পান।
পরে তিনি জানতে পারেন, বাসার ভেতরের একটি কক্ষে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে মরিয়ম ঝুলে আছেন। কক্ষটির দরজা ভেতর থেকে লাগানো ছিল।
পরে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের সহায়তায় এবং উপস্থিত লোকজনের মাধ্যমে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। সেখানে মরিয়মকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় মরিয়মের বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ফজলুল করিম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, চিরকুটটি মরিয়মের হতে পারে। তবে লেখাটি মরিয়মের কি না, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত করে বলা যাবে।
পড়ুন: সায়েন্টিফিক আমেরিকানের প্রতিবেদন: বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার, আক্রান্তের সন্দেহ ১ লাখ ৭৫ হাজার
আর/


