নিউইয়র্কে চলছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। প্রতিবছরের মতো এবারও সাধারণ আলোচনার শুরুতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রথম বক্তব্য দিয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। এরপর বক্তব্য দেন স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে সাধারণ পরিষদের এই বক্তব্য দেওয়ার ক্রম কোনো বর্ণানুক্রমিক তালিকার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা একটি রীতি, যার মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনার সূচনা নির্ধারিত হয়ে আসছে।
১৯৫৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের দশম অধিবেশনে এই রীতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা পায়। মাঝেমধ্যে কিছু ব্যতিক্রম ঘটলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা বহাল রয়েছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৫ সালের প্রথম দিকে অনেক দেশই সবার আগে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। তখন ব্রাজিল এগিয়ে আসে।
২০১০ সালে এনপিআরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের সাবেক প্রটোকল প্রধান ডেসমন্ড পার্কার বলেন, ‘একেবারে প্রথম দিকে, যখন কেউ প্রথমে বক্তব্য দিতে চাইতো না, তখন ব্রাজিলই সবসময় প্রথম বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তাব দিতো। এভাবেই সাধারণ পরিষদে প্রথম বক্তব্য দেওয়ার অধিকার অর্জন করেছে তারা।’
জাতিসংঘের শুরুর সময় থেকেই কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্রাজিলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে সাধারণ পরিষদের প্রথম বিশেষ অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ব্রাজিলের কূটনীতিক ওসভালদো আরানিয়া। ওই অধিবেশনের বৈঠকগুলোতেই ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের বিভাজন পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। পরবর্তী দ্বিতীয় নিয়মিত অধিবেশনেও সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
ব্রাজিলের প্রাথমিক সময়ের সেই নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবেই বক্তব্য দেওয়ার এই সুবিধা দেওয়া হয়েছিল—এমন বিবরণও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে। কারও মতে, এর সঙ্গে শীতল যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে। সে সময় জোটনিরপেক্ষ লাতিন আমেরিকান একটি শক্তিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, যাতে শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাউকে মঞ্চ দেওয়া না হয়।
আরেকটি ব্যাখ্যায় বিষয়টিকে ব্রাজিলের জন্য একধরনের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসন না পেলেও যুদ্ধোত্তর বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় দেশটির গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার অংশ হিসেবেই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
কিছু বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ‘এটা ছিল একধরনের সান্ত্বনা পুরস্কার।’ এতে বৃহৎ শক্তির মর্যাদা না থাকলেও যুদ্ধোত্তর বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় ব্রাজিলের গুরুত্বেরই প্রতিফলন ঘটে।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও এই ব্যবস্থাকে সাধারণ বিতর্কের সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা একটি ‘রীতি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অর্থাৎ, এটি জাতিসংঘ সনদ কিংবা কার্যপ্রণালী বিধিতে নির্ধারিত কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়ম নয়।
প্রতিবছর জাতিসংঘ সচিবালয় ব্রাজিলের মিশনের সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চিত হয়, দেশটি প্রথম বক্তব্য দেওয়ার এই সুযোগ ধরে রাখতে চায় কি না। এখন পর্যন্ত প্রতিবারই ব্রাজিল এ সুযোগ ধরে রাখার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে।
ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের পর অন্য দেশগুলোর ভাষণের ক্রম নির্ধারণ করা হয় প্রতিনিধিত্বের স্তর বিবেচনায় নিয়ে। সেই তালিকায় প্রথমে থাকেন রাষ্ট্রপ্রধানরা, এরপর সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্য প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি ভৌগোলিক ভারসাম্য ও বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ কোন সময়ে করা হয়েছে, সেটিও ক্রম নির্ধারণে বিবেচনায় আসে।
তবে দীর্ঘদিনের এই রীতিতে ব্যতিক্রমের ঘটনাও রয়েছে, যদিও তা খুবই কম। ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে গ্রেনাডায় মার্কিন হস্তক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম বক্তব্য দিয়েছিল। আবার ২০১৬ ও ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিলম্বের কারণে দ্বিতীয় স্লটে বক্তব্য দেয় যথাক্রমে চাদ ও ইকুয়েডর।
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদে ওয়াকআউট করল ইরানি প্রতিনিধি দল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইরানের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প বক্তব্য দেওয়ার সময় ইরানের প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ ত্যাগ করে।
ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সময় এবং হুমকিকে বাড়তে না দেওয়া কিংবা অমীমাংসিত সমস্যাগুলোকে আরও কঠিন হয়ে উঠতে না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করার সময় এই অধিবেশন বর্জনের ঘটনা ঘটে।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি কোনো বিপদকে আরও এক দিন বাড়তে দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সমস্যাগুলো এমনভাবে জিইয়ে রাখতে আমি বিশ্বাস করি না, যাতে সেগুলোর সমাধান করা কেবল আরও কঠিন হয়ে ওঠে।’
পড়ুন: জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বাস-মিনিবাসের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি
আর/


