টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বাটা ইটভাটার মালিকানা ও অংশীদারিত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। চারজনের অংশীদারিত্বে ইটভাটাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রাপ্য অংশ লিখিতভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অপর তিন অংশীদার। এ নিয়ে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও বিষয়টির সমাধান হয়নি। বরং অংশীদারিত্বের দাবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অপর তিনজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে আকবর হোসেনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারী তিন অংশীদার সমেজ উদ্দিন, জুয়েল রানা ও মাসুম কবীর-২০২৩ সালের শেষের দিকে মির্জাপুর উপজেলার বহুরিয়া এলাকায় চারজন মিলে ‘বাটা ইটভাটা’ প্রতিষ্ঠা করেন।তারা চারজনেই উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের মীর দেওহাটা এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে আকবর হোসেনের ৪০ শতাংশ, সমেজ উদ্দিনের ৩০ শতাংশ, জুয়েল রানার ১৫ শতাংশ এবং মাসুম কবীরের ১৫ শতাংশ অংশ রয়েছে। প্রশাসনিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে আকবর হোসেনকে প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর করা হয়।
ইটভাটার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর-সংক্রান্ত একটি মামলার খরচও চার অংশীদার মিলে বহন করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভাটার হিসাব-নিকাশ আকবর হোসেন পরিচালনা করছেন। চলতি বছর অপর তিন অংশীদার তাদের প্রাপ্য অংশ লিখিতভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানালে তিনি তাতে রাজি নন।
বিষয়টি সমাধানের জন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ইটভাটা মালিকদের উপস্থিতিতে একাধিকবার বৈঠক করা হয়। এসব বৈঠকে আকবর হোসেন চারজনের অংশীদারিত্বের বিষয়টি স্বীকার করেন। বৈঠকে তিনি নিজের ৪০ শতাংশ, সমেজ উদ্দিনের ৩০ শতাংশ, জুয়েল রানার ১৫ শতাংশ এবং মাসুম কবীরের ১৫ শতাংশ অংশ রয়েছে বলে স্বীকার করেন। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যার যার অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে টাঙ্গাইল ডিবি কার্যালয় ও মির্জাপুর থানায় অভিযোগ করেন আকবর হোসেন। অভিযোগের পর টাঙ্গাইল ডিবি কার্যালয়ে স্থানীয় ইটভাটা মালিকদের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেখানে আকবর হোসেন উপস্থিত না থাকায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান অপর অংশীদাররা।
কিছুদিন পরে মির্জাপুর থানায় এ নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুনের উপস্থিতিতে চার অংশীদার ও স্থানীয় ইটভাটা মালিকদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আকবর হোসেন চারজনের অংশীদারিত্বের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং দুই দিনের মধ্যে বাকি তিন অংশীদারের অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও অংশীদারিত্ব লিখিতভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন অপর তিন অংশীদার।
বাটা ইটভাটার ম্যানেজার ওয়াসীম হোসেন বলেন,এই ভাটার অংশীদার তারা চারজন। চারজনই মিলে আমাকে এখানে চাকরি দিয়েছেন। বর্তমানে আকবর হোসেন তাদের অংশীদারিত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন না। আমি চাই, তারা চারজন মিলে লিখিতভাবে যার যার অংশ বুঝে নিয়ে পুনরায় একসঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করুক।
মির্জাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাটা ইটভাটার মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইটভাটা মালিকপক্ষ ও চার অংশীদারকে নিয়ে থানায় বসা হয়েছিল। সেখানে আকবর হোসেন স্বীকার করেন যে, তারা চারজন ইটভাটাটির মালিকানার অংশীদার। বৈঠকে বাকি তিন অংশীদারের মালিকানার অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় এবং দুই দিনের মধ্যে তা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত দুই দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তাদের অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
এম,এস,বি ইটভাটার মালিক শাহজাহান সরকার (সারু) বলেন, আকবর হোসেনের বাবা ফজল হোসেন এর আগেও দুটি ইটভাটার ঘটনায় ভাটার মালিকদের সঙ্গে প্রতারণা করে ইট ভাটা দখল করে নিয়েছে। একইভাবে এই ভাটাটিও নিজেদের মালিকানায় নেওয়ার পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে।আমি চাই প্রকৃতপক্ষে এই ভাটার মালিক বাকি তিন জনের অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হোক।
গোড়াই ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান সদস্য ইস্রাফিল সরকার বলেন, ভাটার অংশীদারিত্ব নিয়ে একাধিকবার বসা হয়েছে। বৈঠকে তাদের অংশীদারিত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। কিন্তু সময় নেওয়ার পরও আকবর হোসেন অংশ বুঝিয়ে দেননি। উল্টো সময় নিয়ে তাদের নামে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আকবর হোসেন। তিনি দাবি করেন, বাটা ইটভাটার মালিক তিনি নিজেই, এখানে কোনো অংশীদার নেই। অপর তিন ব্যক্তি তার কাছে টাকা পাবেন এবং টাকা না দেওয়ায় তারা অংশীদারিত্বের দাবি করছেন বলে দাবি করেন তিনি। কাগজপত্রে তাদের নাম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সেগুলোকে ভুয়া কাগজপত্র দাবি করে বলেন, এসব কাগজ তারা নিজেরাই তৈরি করেছেন।
অন্যদিকে, ইটভাটার জমির মালিকেরা বলেন, তারা চারজনের কাছেই জমি ভাড়া দিয়েছেন এবং চারজনকেই তারা ইটভাটার অংশীদার হিসেবেই জানেন।
মালিকানা ও অংশীদারিত্ব নিয়ে দুই পক্ষের এমন পাল্টাপাল্টি দাবিতে বাটা ইটভাটার ব্যবসা ও অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে প্রকৃত অংশীদারদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পড়ুন:আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
ইমি/


