মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশের কনটেইনার জাহাজগুলো নিরাপদে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনও নিশ্চিত করেছেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়া, হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের কনটেইনারবাহী জাহাজ আটকে থাকা এবং সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী সেখানে কাজ করেন এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে আঞ্চলিক সংঘাতের দ্রুত অবসান এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর জোর দেন। বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রয়োজন। প্রয়োজনে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সংলাপের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
বৈঠকের পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মাহদী আমিন। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার রয়েছে। চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি, বাণিজ্য, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ইরান এর আগে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ শিথিল করলে সাত দিনের মধ্যে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চাপ বা আগ্রাসনের কাজে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার কথাও জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য হরমুজ প্রণালির নিরাপদ নৌচলাচল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি এবং জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথনির্ভর হওয়ায় দীর্ঘদিন নৌপথে অচলাবস্থা থাকলে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।
বৈঠকে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি, আমদানি ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে। তাই সংকট দ্রুত নিরসনের ওপর জোর দিচ্ছে ঢাকা।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক ও পেশাজীবী কর্মরত রয়েছেন। সংঘাতের বিস্তার ঘটলে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। সরকার তাদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বৈঠকের পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে নদী ও খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি হলেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম। তাই জলবায়ু ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নত ও উচ্চ নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে তারেক রহমান ও পেজেশকিয়ানের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে সুরক্ষিত রাখা, প্রবাসীদের নিরাপত্তা, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং জ্বালানি সরবরাহের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক উপায়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানের পক্ষে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ঢাকার জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল স্বাভাবিক হওয়া, বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা বজায় রাখা। সংঘাতের গতিপথ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের অগ্রগতির ওপর এসব বিষয়ের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।
পড়ুন:ডলার ছাড়াই টাকায় আমদানি-রপ্তানির অর্থ পরিশোধের সুযোগ
ইমি/


