জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহণ ব্যয়ের চাপ গিয়ে পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। চাল, ডাল, ডিম, মাছ, শাকসবজি থেকে শুরু করে আটা-ময়দা ও ভোজ্যতেল—খুচরা বাজারে বেড়েছে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম। ফলে আয় না বাড়লেও সংসারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষের মাসের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর আগে এলপি গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সবশেষ ২০ সেপ্টেম্বর লিটারপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এতে পণ্যের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না—বাণিজ্যমন্ত্রীর এমন আশ্বাস থাকলেও বাজারে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। পরিবহণ ব্যয় বাড়ার কথা বলে ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন পণ্যের দাম ৩ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বুধবার একাধিক বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। মসুর ডালের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আটার দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ, ময়দার ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ, বেগুনের ৮ দশমিক ৩৩ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কাঁচা মরিচের ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া এক ডজন ডিমের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ। রসুনের দাম কেজিতে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, পাঙাশের ৩ দশমিক ৮৪ থেকে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং পাম ওয়েলের দাম লিটারে ২ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার এমন এক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল, যখন সাধারণ মানুষ আগে থেকেই খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে রয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় সব শ্রেণির ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
বাজারে পণ্যের বাড়তি দামের চিত্রও উঠে এসেছে বুধবারের সরেজমিনে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগের দিন এই চালের দাম ছিল ৫৫ টাকা।
বেগুনের দামও বেড়েছে। আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন ৯০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৮০ থেকে ১২০ টাকা। শসার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা। অথচ এক সপ্তাহ আগেও সর্বনিম্ন ৪০ টাকায় পাওয়া গেছে শসা। কাঁচা মরিচের কেজি এখন ১৬০ টাকা, যা আগে ছিল ১০০ টাকা। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে, আগে ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। করলা কেজিতে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, যা আগে কেজিপ্রতি ৫ টাকা কম ছিল। পটলের দামও কেজিতে ৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০ টাকা।
ডিমের বাজারেও একই চিত্র। খুচরা পর্যায়ে প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়, আগে যার দাম ছিল ১৫০ টাকা। আমদানি করা রসুনের কেজি ১৮০ টাকা, যা আগে ছিল ১৬০ টাকা। বড় দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি, আগে ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকা। খোলা আটার কেজি ৫০ টাকা, আগে ছিল ৪৮ টাকা। খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি, যা আগে ছিল ৬৫ টাকা।
খোলা পাম ওয়েলের দামও বেড়েছে। বর্তমানে লিটারপ্রতি ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আগে ছিল ১৬৬ টাকা। প্যাকেটজাত তরল দুধের লিটার ১১০ টাকা, আগে ছিল ১০০ টাকা। বাজারে তুলনামূলক কম দামের মাছ পাঙাশ ও তেলাপিয়ার কেজিও এখন ২৫০ থেকে ২৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে এসব মাছের দাম ছিল ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা।
কাওরান বাজারে পণ্য কিনতে আসা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, কী থেকে কী করব, জানি না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বিক্রেতারা সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। মাসের শেষদিকে খরচের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিবহণ ব্যয় বাড়ার প্রভাবের কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। একই বাজারে বগুড়া থেকে সবজি নিয়ে আসা ব্যাপারী মো. বাপ্পা মজুমদার বলেন, এক সপ্তাহ আগেও বগুড়া থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আসত ১৮-২০ হাজার টাকায়। এখন ৩-৫ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়েছে পণ্যের দামে।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, এমনিতে পণ্যের দামের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিধ্বস্ত। আয় নেই। বেকারত্ব বাড়ছে। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লেগেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পুরোটা ভোক্তাকে বহন করতে হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত হবে অসাধুরা যাতে পণ্যের দাম বেশি না বাড়াতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা। তাই নজরদারি বাড়াতে হবে।
বাজারে পণ্যের দাম যাতে আরও বেশি না বাড়ে, সে বিষয়ে সরবরাহব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, পণ্যের দামে যাতে বেশি প্রভাব না পড়ে, সেজন্য সরবরাহব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।
সূত্র: যুগান্তর
পড়ুন: বগুড়ায় ট্রাক-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে ২ জন নিহত
আর/


