হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধানরা। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত বৈঠকটি ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় অনুষ্ঠিত হবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। চুক্তিটির মূলনীতিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে সব পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে সৌদি আরবের জাতিসংঘ মিশনে বৈঠক করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
বৈঠকে সৌদি আরবের মক্কা নগরীসহ বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলার তীব্র নিন্দা জানান তিন দেশের মন্ত্রীরা। একই সঙ্গে সৌদি সশস্ত্র বাহিনীর সতর্কতার প্রশংসা করেন তারা। জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অধিকারের প্রতিও সমর্থন জানান।
আলোচনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সামুদ্রিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। পাশাপাশি উত্তেজনা কমিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর তিন দেশের সামরিক প্রধানদের প্রস্তাবিত বৈঠকটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে।
সৌদিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইয়েমেনে তীব্র হচ্ছে লড়াই
এর মধ্যে সৌদি আরবের তায়েফ ও লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু এলাকার দিকে ইয়েমেনের হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। বৃহস্পতিবার এসব ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জোট।
তবে তায়েফ বা ইয়ানবুতে এ হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা স্পষ্ট হয়নি। এর আগে জেদ্দা ও পবিত্র নগরী মক্কাসহ কয়েকটি এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য ইয়ানবু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে এই বন্দর দিয়ে অপরিশোধিত তেল সরবরাহের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
এর মধ্যেই ইয়ানবু দিয়ে তেল রপ্তানি ফের শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল পাম্পের পরিমাণ বাড়াচ্ছিল। ১১ সেপ্টেম্বর ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ওই হামলার জন্য সৌদি আরব ইরাকের একটি মিলিশিয়াকে দায়ী করেছিল।
এদিকে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বৃহস্পতিবার পরে দাবি করেন, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে সৌদি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে তাদের বাহিনী। তবে সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে এ দাবি নিশ্চিত করেনি।
সারি বলেন, কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে।
তার দাবি, জাজানের বিভিন্ন ‘অপারেশন রুম, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, অস্ত্রের গুদাম’, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র ও সামরিক শিবির লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ বুধবার জাজানে সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছিল। তবে বৃহস্পতিবার সেখানে নতুন করে কোনো সতর্কতা জারি করা হয়নি।
এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবুক প্রদেশেও সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। জর্ডান সীমান্তের কাছের এই এলাকায় চলতি মাসে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সর্বশেষ উত্তেজনা শুরুর পর এ ধরনের সতর্কতা এই প্রথম জারি করা হয়।
এর আগে হুতিরা মূলত সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করার পর তারা হামলা বাড়িয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের পুরো অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে তারা দ্রুতগতির অভিযান চালায়। এতে তারা লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মান্দাব জলপথের তীর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সন্ত্রাসী হুতি মিলিশিয়ার যেকোনো উত্তেজনা ও লঙ্ঘনের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাইজ-আদেন সড়ক ঘিরে লড়াই
সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনেও হুতিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর লড়াই তীব্র হয়েছে।
রিয়াদ-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী আদেনের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে হুতিদের রাতভর হামলা প্রতিহত করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের প্রশাসনের ঘাঁটি আদেনে।
সরকারি বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ হিসেবে ব্যবহৃত হেজাত আল-আবদ নামে পরিচিত দুর্গম পাহাড়ি পথটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে হুতিরা। তাইজে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ। হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বাণিজ্যিক বিমান চলাচল না থাকায় বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বাসিন্দাদের জন্যও এটি একমাত্র পথ।
সড়কটির কিছু অংশ দখলে নিতে পারলে তাইজ শহরকে ঘিরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনে ১২ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সর্বশেষ পর্ব এটি। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা স্থবির হয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাইজসহ কয়েকটি পুরোনো যুদ্ধফ্রন্টে আবার লড়াই শুরু হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত ও কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। দেশের ভেতরে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ইয়েমেনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ ছাড়া ৩ হাজারের বেশি মানুষ নৌপথে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকায় পালিয়ে গেছেন।
পড়ুন: বাংলাদেশকে মেরামতে সরকারের ‘থ্রি আর’ কৌশল: প্রধানমন্ত্রী
আর/


