জাতিসংঘ নিখুঁত নয়, তবে বর্তমান বিশ্বে এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য এবং এর কোনো বিকল্প কল্পনা করা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘জাতিসংঘ কোথায় পিছিয়ে পড়ছে তা চিহ্নিত করতে হবে। যেসব বিষয় আর কার্যকর নয়, সেগুলোতে সংস্কার আনতে হবে।’
জাতিসংঘের প্রতি আস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আস্থা চাওয়া যায় না, এটি অর্জন করতে হয়।’ একই সঙ্গে শিল্প খাতের নেতা থেকে শুরু করে তরুণ পরিবর্তনকারীদের মতো আরো বেশি কণ্ঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনায় যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি বলেন, এবারের অধিবেশন এমন একটি জাতিসংঘ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে, যা কঠিন বাস্তবতা মোকাবেলায় যথেষ্ট বাস্তববাদী, সংস্কারের জন্য যথেষ্ট সাহসী এবং প্রয়োজনীয় অংশীজনদের অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্মুক্ত।
তার মতে, এভাবেই জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।
জাতিসংঘে বিরল ইতিহাস প্রধানমন্ত্রীর
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দিয়ে নিজের পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিরল ইতিহাস গড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন তিনি।
সম্পূর্ণ বাংলায় দেওয়া এ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন। একই পরিবারের বাবা, মা ও ছেলে—তিনজন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার ঘটনা আগে ঘটেনি।
নিউইয়র্ক সময় বিকেলে সাধারণ পরিষদ হলে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের পরিবারের সঙ্গে জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চের দীর্ঘ সম্পৃক্ততার কথাও স্মরণ করেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।’
ভাষণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক বিষয়াবলি এবং রোহিঙ্গা সংকটের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তারেক রহমানের এই ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে তার পরিবারের চার দশকেরও বেশি সময়ের সম্পৃক্ততায় নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছে।
জাতিসংঘে পরিবারের প্রথম সদস্য জিয়াউর রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন।
ওই ভাষণে জিয়াউর রহমান ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেন। একই সঙ্গে শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং দেশগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একটি বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
১৩ বছর পর ভাষণ দেন খালেদা জিয়া
এর তেরো বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মা ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
জাতিসংঘের নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন।
এর বাইরে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সভা, ২০০২ সালে শিশু বিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশন চলাকালীন দুটি পৃথক সভায়ও ভাষণ দেন খালেদা জিয়া।
বাবা ও মায়ের পর এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ভাষণ দিয়ে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে ‘দূরদর্শী ও দিকনির্দেশনামূলক’ বললেন রাষ্ট্রপতি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ভাষণকে ‘দূরদর্শী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দিকনির্দেশনামূলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ভাষণের জন্য সরকারপ্রধানকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার দেওয়া এক অভিনন্দন বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে দেশের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা ও অবস্থানকে আরও সমুন্নত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ‘ফ্যাসিবাদী শাসনের’ অবসানের পর গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও এতে স্থান পেয়েছে। ভাষণে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়ের কথাও তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি। দেশের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’—থ্রিআর কৌশলের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, বিশ্বশান্তি, বহুপক্ষীয়তা, ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন।
পড়ুন: এলএনজি খালাস শুরু, কাটতে শুরু করছে গ্যাস সংকট
আর/


