আইফোনের কণ্ঠনির্ভর ভার্চুয়াল সহকারী সিরিকে নতুন করে সাজিয়েছে অ্যাপল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগের উপযোগী করে তৈরি নতুন সংস্করণের সিরি শুধু ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেবে না, বরং আইফোনের পর্দায় কী রয়েছে তা বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন অ্যাপেও কাজ করতে পারবে। ব্যবহারকারীর বার্তা, ক্যালেন্ডারসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুবিধাও যুক্ত করা হচ্ছে এতে।
অ্যাপল জানিয়েছে, নতুন সিরিকে আরও ব্যক্তিগত, কার্যকর ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। নতুন আইওএস ২৭-এর অংশ হিসেবে এটি চালু করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যবহারকারীকে প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা অ্যাপ খুলে নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন কমে আসতে পারে।
নতুন সিরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো আইফোনের পর্দায় থাকা তথ্য বুঝতে পারার সক্ষমতা। কোনো অ্যাপে ব্যবহারকারী কী দেখছেন, সেই তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিরি প্রয়োজনীয় কাজ করার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে একাধিক অ্যাপের তথ্য ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগও থাকবে।
সিরির এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি ধারণা। সিরির মূল ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ড্যাগ কিটলস ও অ্যাডাম শেয়ার। তাদের সঙ্গে টম গ্রুবার ২০০৭ সালে একটি নতুন উদ্যোগ শুরু করেন। এর আগে তারা স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে এমন একটি প্রযুক্তির ধারণা নিয়ে কাজ করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত সার্চ ইঞ্জিনের মতো শুধু তথ্য খুঁজে দেওয়া নয়, বরং ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা।
অ্যাডাম শেয়ার এই ধারণাকে ‘ডু ইঞ্জিন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ ব্যবহারকারী কোনো তথ্য জানতে চাইলে শুধু সেই তথ্য দেখিয়ে দেওয়াই নয়, বরং ব্যবহারকারী যে কাজটি করতে চাইছেন সেটিও সম্পন্ন করে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল তাদের। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সিরির উন্নয়নের সঙ্গে সেই পুরোনো ধারণার মিল রয়েছে।
অ্যাপল ২০১০ সালে ২০ কোটি ডলারের বেশি অর্থের বিনিময়ে সিরি অধিগ্রহণ করে বলে সে সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। এর পরের বছর আইফোন ৪এস-এর সঙ্গে সিরিকে প্রথমবারের মতো যুক্ত করে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ সময় ধরে আইফোনের অন্যতম পরিচিত ফিচার হিসেবে থাকলেও সিরির সক্ষমতা মূলত অ্যালার্ম সেট করা, গান চালানো, আবহাওয়া বা সাধারণ তথ্য জানানো এবং সহজ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
নতুন সংস্করণে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে চাইছে অ্যাপল। নতুন সিরি আইফোনের পর্দায় থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন অ্যাপে কাজ করতে পারবে। ব্যবহারকারীর বার্তা, ক্যালেন্ডার, ই-মেইলসহ বিভিন্ন অ্যাপের তথ্যও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কাজে লাগাতে পারবে বলে জানানো হয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে নতুন সিরির পরীক্ষামূলক সংস্করণ ব্যবহার করে কয়েকটি সক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বার্তা অ্যাপে থাকা তথ্য থেকে ব্যবহারকারীর আসন্ন দাঁতের চিকিৎসার সময়সূচি খুঁজে বের করা। আবার কোনো বন্ধু বার্তায় একটি ব্যান্ডের নাম পাঠালে সেই ব্যান্ড সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য খুঁজে বের করার কাজও করতে পারে নতুন সিরি।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া কোনো রেসিপি পরে দেখার জন্য সংরক্ষণ করার মতো কাজেও সিরিকে ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ ব্যবহারকারীকে নিজে থেকে সংশ্লিষ্ট অ্যাপ খুলে তথ্য খোঁজা, কপি করা বা সংরক্ষণ করার পরিবর্তে কণ্ঠনির্দেশের মাধ্যমে কাজগুলো করার সুযোগ তৈরি হবে।
অ্যাপলের ধারণা, তাদের বিশাল অ্যাপভান্ডার, আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের ব্যাপক ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার ওপর জোর সিরিকে অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সহকারীর তুলনায় আলাদা অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অ্যাপল ‘প্রাইভেট ক্লাউড কম্পিউট’ ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। যেসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ সরাসরি আইফোনে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, সেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যের নির্দিষ্ট অংশ অ্যাপলের সার্ভারে পাঠানো হবে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করা হবে।
তবে নতুন সিরির সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যবহারকারীরা যদি সিরির মাধ্যমে সরাসরি কেনাকাটা, রেস্তোরাঁয় বুকিং, ভ্রমণের পরিকল্পনা বা অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, তাহলে এসব কাজের জন্য আলাদা অ্যাপ ব্যবহারের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। ফলে অ্যাপল ও বিভিন্ন অ্যাপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা বা টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিরির পাশাপাশি গুগলের জেমিনি ও ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারীরাও ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এ ধরনের প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে ব্যবহারকারীরা তথ্য খোঁজা বা কোনো সেবা নেওয়ার জন্য প্রতিবার আলাদা অ্যাপ খুলবেন কি না, সেটি নিয়েও প্রযুক্তি খাতে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সিরির অন্যতম নির্মাতা ড্যাগ কিটলসের মতে, ১৫ বছর আগে যে ধারণা নিয়ে সিরি তৈরি হয়েছিল, মূল লক্ষ্য এখনো একই রয়েছে। তাঁর মতে, ব্যবহারকারীর হয়ে কাজ করে দেওয়ার সেই ধারণা এতদিন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে এবার সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, নতুন এআইনির্ভর সিরি বাস্তবে ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন কাজে কতটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বুঝে বিভিন্ন অ্যাপ ও তথ্যের সমন্বয়ে কাজ সম্পন্ন করতে পারলে আইফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, অ্যাপ নির্মাতাদের স্বার্থ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ব্যবহারকারীর নির্ভরতার বিষয়গুলোও নতুন সিরির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পড়ুন:আইফোন ব্যবহারকারীরা পাবেন ৩০ হাজার কোটি টাকা
ইমি/


