বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‌আমি ‘কলমাকান্দা-দুর্গাপুর’ বাগানের মালী হতে চাই: দুর্নীতির বিরুদ্ধে ডেপুটি স্পিকারের হুঁশিয়ারি

রাজনীতির প্রচলিত ছকে সাধারণত প্রতিশ্রুতি আর ভারী কথারই ছড়াছড়ি থাকে। তবে এর বাইরে গিয়ে যখন কোনো জনপ্রতিনিধি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টকে নিজের করে নেন, কবিতার পঙক্তিতে তুলে ধরেন সচেতনতার বার্তা এবং নিজ দলের বা জোটের নেতাকর্মীদেরও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দেন- তখন তা ভিন্ন মাত্রার রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেয়। ঠিক এমনই ব্যতিক্রমী, মানবিক ও কঠোর প্রশাসক সত্তার প্রকাশ ঘটল জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্যের সাম্প্রতিক বক্তব্যে।

রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কলমাকান্দা উপজেলা পরিষদ হল রুমে ফ্যামিলি কার্ড এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জরিপ-২০২৬ এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের উদ্দেশ্যে দেওয়া নির্দেশনামূলক সভায় তিনি শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনাই দেননি, বরং তুলে ধরেছেন বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের রূপরেখা। উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলমাকান্দার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এন. এম. আবদুল্লাহ আল মামুন।

বক্তব্যের শুরুতেই তিনি ছোট্ট এক মেয়ের বিদ্যুতের অভাব নিয়ে করা অভিযোগের কথা অত্যন্ত দরদের সঙ্গে স্মরণ করেন। দেশব্যাপী চলমান লোডশেডিংয়ের বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়ে তিনি দিনের বেলায় অপ্রয়োজনে বাতি বা ফ্যান না চালানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। একটি কবিতার লাইন উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, দিনের আলোতে অভ্যস্ত হতে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে, যাতে সন্ধ্যায় অন্তত সেই আলো ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুতের জাতীয় সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার যে ক্ষতি হচ্ছে, তার জন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আন্তরিক দুঃখ ও লজ্জিত হওয়ার কথা প্রকাশ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুতই এই সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ‘সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা সমাজ কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চান, আর সেই লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড অত্যন্ত বড় একটি প্রকল্প। তবে অতীতে কার্ড বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের কথা অকপটে স্বীকার করেন ডেপুটি স্পিকার।

তিনি উল্লেখ করেন, আগে টাকার বিনিময়ে বা স্বজনপ্রীতির কারণে বিল্ডিংয়ে বসবাসকারী বা সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম ফ্যামিলি কার্ডে উঠেছিল। এই অনিয়ম রোধে বর্তমান ব্যবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তথ্য সংগ্রহের নিয়মে পরিবর্তন এনেছেন বলে তিনি জানান।

তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রতি তিনি কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, তথ্য সংগ্রহ শুরু করতে হবে ছনের ঘর বা সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের বাড়ি থেকে। পর্যায়ক্রমে যাদের ঘর নেই বা যারা অন্যের বাড়িতে থাকেন, তাদের তালিকাভুক্ত করতে হবে। ভুল করেও যেন বিল্ডিং বা সচ্ছলদের ঘরে আগে যাওয়া না হয়, সে বিষয়ে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দেন।

ডেপুটি স্পিকার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, তথ্য সংগ্রহের কাজের জন্য সরকার সম্মানানী ভাতা দিচ্ছে, তাই এর বাইরে কেউ যদি স্বজনপ্রীতি বা টাকার বিনিময়ে কাজ করে, তবে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি নিজ জোটের (বিএনপি) বা ছাত্রদলের কেউ চাঁদাবাজি বা দুর্নীতি করলে তিনি নিজে বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

দুর্গাপুর-কলমাকান্দার পাহাড়ি পাদদেশে বসবাসরত গারো ও হাজং সম্প্রদায়সহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি তার বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল গভীর ভালোবাসা ও সম্মান। তিনি বলেন, শত অভাব, পানীয় জলের কষ্ট এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাঝেও এই মানুষগুলোর মুখে হাসি থাকে এবং তাদের মধ্যে অপরাধ বা মিথ্যা বলার প্রবণতা নেই বললেই চলে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে তরুণ-তরুণীরা তথ্য সংগ্রহের কাজে যুক্ত হয়েছেন, তাদের সততার ওপর তিনি পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করেন।

বিগত সরকারের আমলে ভাতার টাকা প্রকৃত সুবিধাভোগীর বদলে অন্য মোবাইল নম্বরে চলে যাওয়ার মতো দুর্নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এ ধরনের অনিয়ম আর সহ্য করবে না। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান এবং তাদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দেন তিনি।

দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে আগামী পাঁচ বছর কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরের মানুষের জন্য কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এই জনপ্রতিনিধি। বক্তব্যের শেষভাগে তিনি এক অত্যন্ত কাব্যিক ও আবেগঘন রূপকের আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, কলমাকান্দা-দুর্গাপুর হলো একটি সুন্দর বাগান, আর তিনি এই বাগানের ‘মালী’ হিসেবে কাজ করতে চান। মালী হয়ে তিনি এই বাগানের পরিচর্যা করার সুযোগ চেয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

সচরাচর এমন বক্তব্য খুব একটা চোখে পড়ে না, যেখানে একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিজের সরকারের সীমাবদ্ধতার জন্য ক্ষমা চান, দরিদ্রের অধিকার রক্ষায় নিজ দলের লোকদেরও জেলে পাঠানোর হুমকি দেন এবং দিনশেষে নিজেকে কেবল একজন সেবক বা ‘মালী’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে দুর্গাপুর-কলমাকান্দার সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : জাফলংয়ে পর্যটন দিবসে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও ব্যবসায়ী সমিতির র‍্যালি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন