বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিদেশি ঋণ ছাড়ের আড়াই গুণ পরিশোধ

উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত হারে বিদেশি ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। বিপরীতে আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পেয়েছে, তার প্রায় আড়াই গুণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। একই সময়ে নতুন বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে নতুন অর্থছাড় কমে যাওয়া, অন্যদিকে আগের ঋণের কিস্তি, সুদ ও আসল পরিশোধ বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে টাকার বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন এবং ঋণের সুদের হার বৃদ্ধিও পরিশোধের চাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে মোট বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান হিসেবে ছাড় হয়েছে প্রায় ২৯ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।

গত দুই মাসে ছাড় হওয়া অর্থের মধ্যে অনুদান হিসেবে এসেছে প্রায় ৩৩ লাখ ডলার। আর প্রকল্প ঋণ হিসেবে পাওয়া গেছে প্রায় ২৯ কোটি ১৩ লাখ ডলার। খাদ্য সহায়তা খাতে এ সময়ে কোনো অর্থছাড় হয়নি।

অন্যদিকে নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতিতেও তেমন অগ্রগতি হয়নি। জুলাই ও আগস্টে মোট ২৪ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অনুদান হিসেবে প্রতিশ্রুতি রয়েছে ৯ কোটি ৭১ লাখ ১০ হাজার ডলার এবং প্রকল্প ঋণ হিসেবে ১৪ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

গত অর্থবছরের একই সময়ে মোট বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ৩৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে নতুন প্রতিশ্রুতির পরিমাণও আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমেছে।

তবে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় ও প্রতিশ্রুতির তুলনায় ঋণ পরিশোধের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাংলাদেশকে মোট ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। দেশের মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ১০ হাজার ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানেই বিদেশি ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ ডলার বা ৪৯৫ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে পরিশোধ করা ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলারের মধ্যে মূল ঋণ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৫১ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। আর ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার, যা প্রায় ২ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।

অর্থাৎ নতুন করে যে পরিমাণ বৈদেশিক সহায়তার অর্থ দেশে এসেছে, তার তুলনায় আগের ঋণের দায় পরিশোধে অনেক বেশি অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বৈদেশিক ঋণের নিট প্রবাহ আরও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বা ৯০০ কোটি ডলারের মতো বিদেশি ঋণ পাওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতেই অর্থছাড়ের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্থ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার করে ঋণ পাওয়া গেছে। একই সময়ে বছরে গড়ে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার করে ঋণের দায় পরিশোধ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ায় পরিস্থিতি আগের তুলনায় পরিবর্তিত হচ্ছে।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ৪৪৯ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৪ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৪০৮ কোটি ডলার বা ৪৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৪১ কোটি ডলার বা ৬ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।

ইআরডির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ছোট-বড় বিভিন্ন প্রকল্পে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসলসহ কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় দায় বাড়ছে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশের জন্য কিছু উন্নয়ন সহযোগীর ঋণের শর্ত ও সুদের হারেও পরিবর্তন এসেছে।

এর পাশাপাশি বাজারভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী বিনিময় হার নমনীয় করার ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমেছে। এতে ডলারে নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে বাংলাদেশি মুদ্রায় ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মতে, পুরোনো ঋণের কিস্তি যে হারে পরিশোধ করতে হচ্ছে, সেই হারে নতুন ঋণের অর্থছাড় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।

অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি সময়মতো অর্থছাড় এবং ভবিষ্যৎ পরিশোধ সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখতে হয়। বর্তমানে নতুন ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়া এবং পুরোনো ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ বেড়ে যাওয়ার কারণে সেই ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিই সামনে এসেছে।

চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থছাড় ও নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কতটা বাড়ে, তার ওপর সামগ্রিক পরিস্থিতির অনেকটাই নির্ভর করবে। একই সঙ্গে বড় প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধের সময়সূচি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের চাপ কতটা বাড়বে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পড়ুন:আবারও কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে ২১৫৮ টাকা

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন