২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের রূপকথার অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে দলকে শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ৪০ বছর বয়সী এই গোলকিপার। শক্তিশালী আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখে আলোচনায় আসেন তিনি।
বিশ্বকাপের সেই পারফরম্যান্স ভোজিনিয়ার ক্যারিয়ারে এনে দেয় নতুন মাত্রা। তবে খ্যাতির সঙ্গে আসা অতিরিক্ত মনোযোগ যে তার ব্যক্তিগত জীবনে স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে, সেটিই এখন বলছেন কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষক। চিলির ক্লাব কোলো কোলোতে খেলা ভোজিনিয়া জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের পর রাতারাতি পাওয়া জনপ্রিয়তার কারণে আগের সাধারণ জীবনকে তিনি এখন ভীষণভাবে মিস করেন।
‘দ্য অবজারভার’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে ভোজিনিয়া বলেন, ‘আমাকে যদি আজকের এই জীবন আর আগের জীবনের মধ্যে বেছে নিতে বলা হয়, তবে আমি নির্দ্বিধায় আগের জীবনটাই বেছে নেব।’
বিশ্বকাপের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোজিনিয়ার অনুসারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৬ হাজার। কিন্তু টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর সেই সংখ্যা রাতারাতি বেড়ে দাঁড়ায় মিলিয়নে। বিশেষ করে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের পর তার জনপ্রিয়তা আরও দ্রুত বাড়তে থাকে।
সেই সময়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে ভোজিনিয়া বলেন, দলের ক্যাটারিং স্টাফের একজন হঠাৎ এসে তাকে জানান, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেননি তিনি।
ভোজিনিয়ার ভাষায়, ‘দলের ক্যাটারিং স্টাফের এক সদস্য হুট করে আমার কাছে এসে বলল, আমার নাকি ১০ লাখ ফলোয়ার হয়ে গেছে! সে কী নিয়ে কথা বলছে, প্রথমে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম হয়তো মজা করছে।’
পরে মিক্সড জোনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় এক সাংবাদিকও তাকে একই বিষয় জানান। নিজের ফোনে অনুসারীর সংখ্যা দেখানোর পর বিষয়টি নিশ্চিত হন ভোজিনিয়া। তখনই বুঝতে পারেন, বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স তাকে কতটা দ্রুত সাধারণ এক ফুটবলার থেকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।
তবে এই জনপ্রিয়তার নেতিবাচক দিকও রয়েছে বলে মনে করেন ভোজিনিয়া। তার মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তায়। এখন বাইরে বের হলে কিংবা কোনো রেস্তোরাঁয় গেলেই সমর্থকেরা ছবি তোলা, অটোগ্রাফ নেওয়া কিংবা ভিডিও করার জন্য এগিয়ে আসেন।
ভোজিনিয়া বলেন, ‘আমি আমার জীবনের শান্ত পরিবেশটা হারিয়ে ফেলেছি। আগের মতো এখন আর কোনো প্রাইভেসি নেই বললেই চলে। এখন বাইরে কোথাও বের হলে কিংবা কোনো রেস্তোরাঁয় গেলে সবসময়ই কেউ না কেউ এসে ছবি তুলতে চায়, অটোগ্রাফ চায়।’
তার মতে, অনুমতি ছাড়া ভিডিও করা আরও অস্বস্তিকর। এই হঠাৎ বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই এখন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
শুধু ভোজিনিয়া নন, তার জনপ্রিয়তার প্রভাব পড়েছে পরিবারের ওপরও। সমর্থকদের কেউ কেউ কেপ ভার্দেতে তার বাবা-মায়ের বাড়িতেও হাজির হন। তারা ভোজিনিয়ার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে কিংবা ছবি তুলতে চান। তার বাবা অবশ্য এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখতেই পছন্দ করেন।
ভোজিনিয়ার আক্ষেপ, তিনি চিলিতে থাকায় বাবা-মায়ের পাশে থেকে পরিস্থিতি সামলাতেও পারছেন না। তাই সমর্থকদের সঙ্গে কীভাবে সীমারেখা তৈরি করতে হবে, সেটি তার পরিবারের সদস্যদেরই ধীরে ধীরে শিখে নিতে হচ্ছে।
এদিকে বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ‘লেভ ইয়াশিন’ পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছিলেন ভোজিনিয়া। তবে সম্প্রতি আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের বাছাইপর্বে মালির বিপক্ষে ম্যাচে একটি ভুল করে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি।
ম্যাচে তার ভুল থেকেই গোল হজম করে কেপ ভার্দে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৩-১ গোলে হেরে যায় দলটি। বিশ্বকাপের নায়ক ভোজিনিয়ার জন্য সেই ভুল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
তবে সবকিছুর পরও বিশ্বকাপ তার ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দিয়েছে। একদিকে নতুন সুযোগ, পরিচিতি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে; অন্যদিকে হারিয়েছে ব্যক্তিগত জীবনের আগের স্বস্তি ও গোপনীয়তা। আর সেই কারণেই ভোজিনিয়ার কাছে বিশ্বকাপ-পরবর্তী জীবন যতটা উজ্জ্বল, ততটাই কঠিন।
পড়ুন:জার্মানির মাঠে গ্রিসের ঐতিহাসিক জয়
ইমি/


