একটি গান বদলে দিয়েছিল অভিনেতা নকুল কাপুরের পরিচয়। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘তুম সে অচ্ছা কৌন হ্যায়’ সিনেমার ‘আঁখ হ্যায় ভরী ভরী’ গানটি জনপ্রিয় হওয়ার পর রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন তিনি। সুদর্শন চেহারা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ‘চকলেট বয়’ ইমেজ দিয়ে সে সময়ের তরুণ দর্শকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছিলেন এই অভিনেতা। অনেকেই মনে করেছিলেন, বলিউডে নতুন প্রজন্মের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠতে পারেন নকুল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গল্প আর সেভাবে এগোয়নি। প্রথম সিনেমার সাফল্যের পর বড় পর্দায় নিয়মিত দেখা যায়নি তাকে। ধীরে ধীরে অভিনয়জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন নকুল। এরপর বেছে নেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন—যোগব্যায়াম ও আধ্যাত্মিকতার পথ।
নকুল কাপুরের জন্ম ১৯৭৪ সালের ১১ জুলাই ভারতের দিল্লিতে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা ও অ্যাডভেঞ্চারধর্মী কর্মকাণ্ডের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। শুধু অভিনয় নয়, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কসরত ও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসেও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি।
ডাইভিংয়ে জাতীয় পর্যায়েও সাফল্য পেয়েছিলেন নকুল। বাঞ্জি জাম্পিংসহ নানা অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল তার। ফলে অভিনয়ে আসার আগেই শারীরিক সক্ষমতা ও সাহসী ব্যক্তিত্বের কারণে আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল তার।
বলিউডে প্রবেশের আগে বিজ্ঞাপন ও মডেলিংয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেন নকুল। একটি ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপন তাকে বড় পরিসরে দর্শকের সামনে নিয়ে আসে। এরপর বিভিন্ন মিউজিক ভিডিওতেও দেখা যায় তাকে।
১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেন তিনি। শিবানী কাশ্যপের ‘হো গয়ী হ্যায় মোহব্বত তুমসে’ এবং নুসরাত ফতেহ আলি খানের ‘আজা মেরে ইয়ার’—এর মতো মিউজিক ভিডিওতে তার উপস্থিতি দর্শকদের নজর কাড়ে। এসব কাজের সূত্র ধরেই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।
২০০২ সালে পরিচালক দীপক আনন্দের ‘তুম সে অচ্ছা কৌন হ্যায়’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় নকুল কাপুরের। সিনেমাটিতে কিম শর্মা ও আরতি ছাবরিয়ার সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। তার চরিত্রের নাম ছিল অর্জুন সিং।
ছবিটির গানগুলো তরুণ দর্শকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ‘আঁখ হ্যায় ভরী ভরী’ গানটি নকুলকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। তার চেহারা ও পর্দায় উপস্থিতির কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ‘চকলেট বয়’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।
সে সময় বলিউডে শাহরুখ খান, সালমান খান ও আমির খানের মতো প্রতিষ্ঠিত তারকাদের পাশাপাশি একাধিক নতুন অভিনেতাও নিজেদের জায়গা তৈরির চেষ্টা করছিলেন। নকুলকেও সেই নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু অভিষেকের পর প্রত্যাশা অনুযায়ী তার অভিনয় ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়নি।
প্রথম সিনেমার পর নকুলকে আর নিয়মিত হিন্দি ছবিতে দেখা যায়নি। ২০০৫ সালে কানাডার টেলিভিশন সিরিজ ‘টার্মিনাল সিটি’-তে অভিনয় করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে বিনোদনজগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ কমতে থাকে।
একসময় পর্দা থেকে পুরোপুরি আড়ালে চলে যান নকুল। তার হঠাৎ অন্তর্ধান নিয়ে দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। দীর্ঘদিন তাকে জনসমক্ষে দেখা না যাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের আলোচনা ও গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে।
২০১৫ সালে নকুল কাপুরকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার মৃত্যুর খবর। বিভিন্ন জায়গায় দাবি করা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তিনি। আবার কোনো কোনো পোস্টে বলা হয়, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তার মৃত্যু হয়েছে।
তবে এসব তথ্যের সত্যতা ছিল না। শেষ পর্যন্ত নকুল নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে জানান, তিনি জীবিত এবং সুস্থ আছেন। তার সেই বক্তব্যের পর মৃত্যুর গুজবের অবসান ঘটে।
একই সময় তার জীবন সম্পর্কে নতুন কিছু তথ্যও সামনে আসে। জানা যায়, অভিনয় থেকে সরে গিয়ে তিনি নিজের জীবনের গতিপথই বদলে ফেলেছেন।
বিনোদনজগতের ব্যস্ততা ও চাপ থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর যোগব্যায়াম এবং আধ্যাত্মিকতার দিকে মনোযোগ দেন নকুল। পরবর্তী সময়ে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারে বসবাস শুরু করেন তিনি।
যোগব্যায়ামের প্রতি তার আগ্রহ একসময় পেশাগত কাজেও রূপ নেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নকুল বর্তমানে যোগশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। ‘ডিভাইন লাইফ যোগ’ নামে একটি যোগকেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গেও তার নাম জড়িত।
সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষকে যোগব্যায়াম শেখানোর পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়ে কাজ করেন তিনি। অর্থাৎ, যে মানুষটি একসময় সিনেমার পর্দায় নিজের উপস্থিতি দিয়ে দর্শকের নজর কেড়েছিলেন, তার বর্তমান জীবন অনেকটাই ভিন্ন
নকুল কাপুরের ক্যারিয়ার বলিউডের সেই সব গল্পের একটি, যেখানে অভিষেকের পর দ্রুত জনপ্রিয়তা এলেও দীর্ঘমেয়াদি অভিনয় ক্যারিয়ার তৈরি হয়নি। একটি জনপ্রিয় গান তাকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তুলেছিল। তরুণ দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল আলাদা গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাকে নিয়মিত চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে রূপ দিতে পারেননি তিনি।
পরবর্তী সময়ে অবশ্য তিনি অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। অভিনয়ের আলো থেকে সরে গিয়ে যোগব্যায়াম, আধ্যাত্মিকতা এবং জীবনযাপনের ভিন্ন দর্শনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছেন।
একসময় ‘আঁখ হ্যায় ভরী ভরী’ গানের মাধ্যমে যে নকুল কাপুর বলিউডের তরুণ অভিনেতা হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন, আজ তার পরিচয় অনেকটাই আলাদা। রুপালি পর্দার জনপ্রিয়তার বদলে যোগচর্চাকেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে নিয়েছেন তিনি। তার জীবন তাই বলিউডের প্রচলিত তারকা-গল্পের চেয়ে বেশ ভিন্ন—খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছানোর পরও আলো থেকে সরে গিয়ে নিজের পছন্দের এক নতুন জীবন বেছে নেওয়ার গল্প।
পড়ুন:ভিএমএএসে নতুন ইতিহাস, সর্বোচ্চ পুরস্কারজয়ী টেইলর সুইফট
ইমি/


