দীর্ঘদিনের পরীক্ষার পর অবশেষে বড় সাফল্য পেল ইলন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের স্টারবেস থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর উৎক্ষেপণের পর প্রথমবারের মতো কক্ষপথে পৌঁছেছে স্টারশিপ। একই মিশনে নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক স্যাটেলাইটও মহাকাশে পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। স্টারশিপের ইতিহাসে এটি ছিল ১৪তম পরীক্ষামূলক ফ্লাইট এবং প্রথম সফল কক্ষপথযাত্রা।
এর আগে ১৩টি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল স্পেসএক্স। এসব মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল স্টারশিপের বিভিন্ন প্রযুক্তি, ইঞ্জিন, তাপরোধী ব্যবস্থা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্যতার সক্ষমতা পরীক্ষা করা। তবে কোনো মিশনই পৃথিবীর কক্ষপথে পূর্ণাঙ্গভাবে পৌঁছাতে পারেনি। এবারের ফ্লাইটে সেই বাধা অতিক্রম করেছে স্টারশিপ।
সোমবার সকালে টেক্সাসের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত স্টারবেস থেকে স্টারশিপ উৎক্ষেপণ করা হয়। স্পেসএক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৭৫ মিনিটের লঞ্চ উইন্ডো শুরু হওয়ার কথা ছিল স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সফলভাবে যাত্রা শুরু করে বিশালাকার রকেটটি।
স্টারশিপ মূলত দুটি অংশে তৈরি—নিচের সুপার হেভি বুস্টার এবং ওপরের স্টারশিপ মহাকাশযান। উৎক্ষেপণের পর সুপার হেভি থেকে আলাদা হয়ে স্টারশিপ নিজের ছয়টি র্যাপ্টর ইঞ্জিনের সাহায্যে মহাকাশের দিকে এগিয়ে যায়।
প্রায় ২৬ মিনিটের মাথায় কক্ষপথে প্রবেশের ধাপ সম্পন্ন করে মহাকাশযানটি। এরপর শুরু হয় এই মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ—নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক স্যাটেলাইট মহাকাশে স্থাপন।
এই মিশনে স্টারলিংক নেটওয়ার্কের নতুন প্রজন্মের V3 স্যাটেলাইট বহন করছিল স্টারশিপ। স্পেসএক্স জানিয়েছে, এই স্যাটেলাইটগুলো আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষমতা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। একটি স্টারলিংক V3 স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রায় ১ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত ডাউনলিংক সক্ষমতা যোগ করার লক্ষ্য রয়েছে।
স্পেসএক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে স্টারশিপের বিশাল পেলোড ধারণক্ষমতা কাজে লাগিয়ে একসঙ্গে অনেক বেশি স্টারলিংক স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠানো সম্ভব হবে। এর ফলে বৈশ্বিক ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে স্টারলিংক ইতোমধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে হাজার হাজার স্যাটেলাইট পরিচালনা করছে। স্পেসএক্সের নিজস্ব নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তাদের কক্ষপথে প্রায় ৯ হাজার ৬০০টি স্টারলিংক ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল স্যাটেলাইট ছিল।
স্টারশিপের সফল কক্ষপথযাত্রাকে স্পেসএক্সের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো এমন একটি মহাকাশযান তৈরি করা, যা দ্রুত পুনর্ব্যবহার করা যাবে এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে বড় পরিমাণ মালামাল ও মানুষ মহাকাশে নিয়ে যেতে পারবে।
স্পেসএক্সের নিজস্ব পরিকল্পনায় স্টারশিপের প্রাথমিক কক্ষপথযাত্রা প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার উচ্চতায় পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। মিশনটির পরিকল্পিত সময় ছিল প্রায় ১০ ঘণ্টা এবং পৃথিবীকে প্রায় ছয়বার প্রদক্ষিণ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছিল।
এবারের মিশনের আরেকটি লক্ষ্য ছিল স্টারশিপের তাপরোধী ব্যবস্থা বা হিটশিল্ড পরীক্ষা করা। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার সময় প্রচণ্ড তাপ সহ্য করতে হয় মহাকাশযানকে। ভবিষ্যতে স্টারশিপকে সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করতে হলে এই প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্টারশিপকে ঘিরে স্পেসএক্সের পরিকল্পনা শুধু পৃথিবীর কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাসার চন্দ্রাভিযান পরিকল্পনাতেও এই মহাকাশযানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভবিষ্যতে স্টারশিপের বিশেষ সংস্করণ ব্যবহার করে নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মঙ্গলগ্রহে মানববসতি স্থাপনের লক্ষ্যও প্রকাশ করেছেন ইলন মাস্ক। সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় বিপুল পরিমাণ মানুষ ও সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য স্টারশিপকে গুরুত্বপূর্ণ যান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের মতো আরও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। কক্ষপথে স্থাপিত অবকাঠামো ব্যবহার করে ভবিষ্যতে বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি পরিচালনার ধারণা নিয়ে কাজ করছে স্পেসএক্স।
তবে এবারের সাফল্যের মধ্যেও সবকিছু নিখুঁত ছিল না। মিশনের সময় একটি ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয় এবং পরিকল্পনার তুলনায় ফ্লাইটটি আগেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারপরও কক্ষপথে পৌঁছানো এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইট স্থাপন—দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জন করেছে স্পেসএক্স।
স্টারশিপের প্রথম কক্ষপথযাত্রা তাই স্পেসএক্সের পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ। এই সাফল্য ভবিষ্যতে মহাকাশযানটির নিয়মিত বাণিজ্যিক ব্যবহার, বৃহৎ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতিতে কীভাবে কাজে লাগে, সেটিই এখন নজরে থাকবে।
পড়ুন:ভিএমএএসে নতুন ইতিহাস, সর্বোচ্চ পুরস্কারজয়ী টেইলর সুইফট
ইমি/


