মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে আজ নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিককে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নীতিমালা ঘোষণা করবে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান।
নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতি কম থাকায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। ফলে আগামী তিন মাসে অর্থনীতিতে তারল্য, ঋণের সুদহার এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান কী হবে, সেদিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর আগের মাস জুনে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সামান্য উন্নতি হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এখনো ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।
চলতি বছরের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ সুদহারের কারণে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাংকঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুদহারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। গত ২ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে। নীতি সুদহার কমানোর পর ব্যাংকঋণের খরচ কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
এ কারণে নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হবে, নাকি অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মাসের মধ্যে আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় এখনো মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
এ অবস্থায় নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণ ও অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোও জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন মুদ্রানীতিতে এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা থাকতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা ও উদ্যোক্তাদের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে বছরে দুইবারের পরিবর্তে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তাবও সম্প্রতি সংসদীয় কমিটিতে এসেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাই এ প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য। বছরে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলে অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও ঘন ঘন নীতিগত সমন্বয় করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে আজকের মুদ্রানীতি ঘোষণায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নীতি সুদহার, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি—সবকিছুতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের আগামী তিন মাসের অবস্থান স্পষ্ট হবে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কীভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগের গতি বাড়ানো যায়, সেটিই নতুন মুদ্রানীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠবে।
পড়ুন:টিসিবির কার্ডে কারা অগ্রাধিকার পাবেন, জানাল সরকার
ইমি/


