সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের মদের ৪ গুদাম সিলগালা

‘অননুমোদিত’ গুদামে শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের চারটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি গুদাম বৈধ বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে দক্ষিণ গুলশানের ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’-এ যৌথ অভিযান চালিয়ে গুদামগুলো সিলগালা করা হয়। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১ (এসআরবি-১) যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে।

জানা যায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত রাতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) নেতৃত্বে Customs Intelligence and Investigation Department এবং SRB-এর সমন্বয়ে গঠিত টিম রাজধানীর গুলশানে TOS Bond Pvt. Ltd. নামের একটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা মদ ও বিয়ার সংরক্ষণ এবং হিসাব ব্যবস্থাপনায় একাধিক অনিয়ম শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কাস্টমস আইন অনুযায়ী ডিএনসির উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউজ সিলগালা করে।

অভিযানকালে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) অনুমোদিত সফটওয়্যার এবং গুদামে সংরক্ষিত পণ্যের সরেজমিন তথ্য যাচাই করে। এ সময় সফটওয়্যারে Exbond দেখানো হলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজে থাকা ১৪৪ ক্যান বিয়ার, ১২ বোতল হুইস্কি এবং ৬ বোতল Nemiroff পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সফটওয়্যারে পণ্যগুলো প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড় হয়েছে বলে দেখানো হলেও সরেজমিনে সেগুলো প্রতিষ্ঠানের হেফাজতে পাওয়া যায় বলে জানায় ডিএনসি।

এছাড়া আমদানিকৃত ২,২৫০ কার্টন Heineken Beer প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার সিস্টেমে ০৩/০৯/২০২৬ তারিখে Inbound হিসেবে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়। কিন্তু যৌথ অভিযানে যাচাই করে দেখা যায়, উক্ত পণ্যগুলো প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজে বাস্তবে পাওয়া যায় নি।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানের মোট চারটি ফ্লোর এর মধ্যে দুটি ফ্লোর এর কাস্টমসের অনুমোদন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য/অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

ডিএনসির নেতৃত্বে পরিচালিত যৌথ অভিযানে এসব অসঙ্গতি ও অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউজ সিলগালা করা হয়। বিষয়টি অধিকতর যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএনসি।

এনবিআরের তদন্ত: কানাডায় সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের বিপুল পরিমাণ সম্পদ

সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের কানাডাভিত্তিক সম্পদ, ব্যবসা এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। প্রায় এক দশকের ১৬৩টি আর্থিক নথি পর্যালোচনা করে তাঁদের আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শেখ নুর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আর্থিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পর্যালোচনা করা নথিতে সন্দেহজনক লেনদেন (এসটিআর), বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন (সিটিআর), ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেনসহ ডজনখানেক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে শেখ নুর ইসলামের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী শীলা ইসলাম এবং দুই কন্যা দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নাম রয়েছে। দিশা ইসলাম সালমান মুক্তাদিরের স্ত্রী। নথি অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যরা কানাডার প্রবাসাধিকার বা নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন এবং দেশটিতে একাধিক লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

নথিতে বলা হয়েছে, শেখ নুর ইসলাম, শীলা ইসলাম, দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলাম ‘শেখ নুর ম্যানেজমেন্ট ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক। শেখ নুর ইসলামকে ‘১৭৭১০৬৯ অন্টারিও ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক ও প্রেসিডেন্ট হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁর পেশা হিসেবে রিয়েল এস্টেট ব্যবস্থাপনা এবং ‘জুম জুম পিৎজা’ ব্যবসার মালিকানার তথ্য রয়েছে।

শীলা ইসলামের ডমিনোজ পিৎজার ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে। অন্যদিকে দিশা ইসলাম কানাডার সান লাইফে বিনিয়োগ পরামর্শক ও সেগ্রিগেটেড ফান্ড বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁকে ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবেও দেখানো হয়েছে। পরিবারের আরেক সদস্য তাসনিম ইসলামও কানাডার নাগরিক এবং ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৯ কানাডিয়ান ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে ব্রিটিশ পাউন্ড, সিঙ্গাপুর ডলার, থাই বাথ ও মার্কিন ডলারে লেনদেনের তথ্যও রয়েছে।

কানাডায় পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত, যৌথ ও কোম্পানির নামে একাধিক ব্যাংক হিসাব থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শীলা ইসলামের নামে একটি মর্টগেজ হিসাবও রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের কর নথিতেও শেখ নুর ইসলামের একাধিক ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৩-২৪ করবর্ষে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি টাকা ছিল। পরের করবর্ষে তা বেড়ে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কর নথি অনুযায়ী, বর্ষা মানি চেঞ্জিং সেন্টার, বর্ষা ডেইরি ফার্ম ও বর্ষা ফিশারিজের মতো ব্যবসার পাশাপাশি ডমিনোজ পিৎজা, ফুওয়াং বোলিং, ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার, রেডিও মাসালা, স্পাইস টেলিভিশন, স্টারবাকস ক্যাফে ও টিম হর্টনসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে শেখ নুর ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর নথিতে কানাডার ‘শেখ নুর ম্যানেজমেন্ট’, ‘১৭৭১০৬৯ অন্টারিও ইনকর্পোরেটেড’ কিংবা ঢাকার ওয়্যারহাউজ ‘টস বন্ড’-এর নাম পাওয়া যায়নি। একইভাবে কানাডার নাগরিকত্বের তথ্যও এসব কর নথিতে নেই বলে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে।

এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) গভীর রাতে সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ছত্রছায়ায় পরিচালিত ‘অননুমোদিত’ ওয়্যারহাউসে শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে চারটি ওয়্যারহাউস সিলগালা করা হয়েছে।

এদিকে ঢাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে হামলার ঘটনায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর শেখ নুর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের আর্থিক বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কানাডায় অর্থ লেনদেন ও সম্পদের বিষয়ে চলমান তদন্তের সঙ্গে সাম্প্রতিক ওই ঘটনার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

পড়ুন : মদিনার বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা: হুতিদের দায়ী করল সৌদি জোট

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন