দুই দশক পর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণ শুরু

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা পুরোনো ও বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ অপসারণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে ধ্বংসের জন্য ৯টি কনটেইনার নারায়ণগঞ্জে পাঠানো হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরের এইট বি ইয়ার্ড থেকে রাসায়নিক বহনকারী গাড়িগুলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত ওয়াটা কেমিক্যালসের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

প্রথম ধাপে সরিয়ে নেওয়া ৯টি কনটেইনারের মধ্যে রয়েছে কের সালফিউরিক অ্যাসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিডের একটি কনটেইনার, মিথানলের পাঁচটি এবং থিনারের দুটি কনটেইনার। এসব বিপজ্জনক রাসায়নিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জে নেওয়া হচ্ছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, আমদানির পর বিভিন্ন কারণে রাসায়নিকগুলো বন্দর থেকে খালাস করা হয়নি। এর সঙ্গে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতাও যুক্ত হয়। ফলে বিপজ্জনক রাসায়নিক ভর্তি কনটেইনারগুলো দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকে।

এভাবে দীর্ঘদিন আটকে থাকা ২৯টি কনটেইনারে মোট প্রায় ৮১ টন রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব রাসায়নিক বন্দরে পড়ে থাকায় তা বন্দরের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে ওঠে। বিষয়টি সমাধানে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এর ধারাবাহিকতায় প্রথম ধাপে ৯টি কনটেইনার সরিয়ে নারায়ণগঞ্জে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় রাসায়নিক বহনকারী গাড়িগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের এইট বি ইয়ার্ড থেকে রূপগঞ্জের ওয়াটা কেমিক্যালসের উদ্দেশে যাত্রা করে।

সারা বছরই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রাসায়নিক পণ্য আমদানি করা হয়। কিন্তু আমদানিকারকরা যথাসময়ে পণ্য খালাস না করার কারণে বন্দরের ‘পি’শেডটি রাসায়নিক পণ্য রাখার গুদামে পরিণত হয়েছে। এদিকে বিপজ্জনক পণ্য চিহ্নিত করার যথাযথ কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যেকোন মুহূর্তে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা বন্দরে।

আমদানি হওয়া রাসায়নিক পণ্যের গায়ে মূল উপাদানের নাম না লিখে শুধুমাত্র এ পণ্যটি কী কাজে ব্যবহার করা হয় সেটাই লেখা থাকে। রাসায়নিক পণ্যে গায়ে যথাযথ পণ্য চিহ্নিতকরণ লেবেল না থাকায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পণ্যটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না।

বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো রাসায়নিক পণ্য আমদানি করে থাকে। চাহিদা কমে গেলে অনেক সময় আমদানিকারকরা পণ্য খালাস না করে ‘পি’শেডেই রেখে দেন। এতে পণ্য জট তৈরি হয়। এসব পণ্য খালাস না হলে অথবা নিলামে বিক্রি না হলে ধ্বংস করে দিতে হয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে। এর আগেও বার বার নিলামে তুলে প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে পণ্যগুলো বিক্রি করতে পারেনি কাস্টমস। তাই বন্দরের ঝুঁকি কমাতে ৩০ লটের আরও নয় হাজার ৪৭৮ কেজি রাসায়নিক পণ্য ধ্বংসের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের ১৪টি শেড রয়েছে। এর মধ্যে ‘পি’শেডে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, হাইড্রোক্লোরাইড, কস্টিক সোডা, সালফেট, টেক্সটাইল কেমিক্যাল, রঙ তৈরির কাঁচামাল, এস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ রাখা হয়। এখান থেকেই রাসায়নিক পণ্যের খালাস দেয়া হয়।

‘পি’ শেডে ৮৩ লটে ৫৮ হাজার ৩৪৮ কেজি রাসায়নিক পণ্য ছিল। এরমধ্যে এখন পর্যন্ত ৫৩ লটে থাকা ৪৮ হাজার ৮৭০ কেজি রাসায়নিক পণ্য ধ্বংস করা হয়েছে। বাকি ৩০ লটের ৯ হাজার ৪৭৮ কেজি রাসায়নিক পণ্য ধ্বংসের জন্য সুনামগঞ্জের ছাতকে লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিনিধির নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, বন্দরে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি আয়তনের ‘পি’শেডটিতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, হাইড্রোক্লোরাইড, কস্টিক সোডা, সালফেট, টেক্সটাইল কেমিক্যাল, রঙ তৈরির কাঁচামাল, এস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ রাখা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের আমদানি করা রাসায়নিক পদার্থের ৯৮ ভাগই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের উপ-কমিশনার (নিলাম শাখা) আলী রেজা হায়দার বলেন, রাসায়নিক পণ্য এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। তার উপর দিনের পর দিন পণ্যগুলো পি শেডে পড়ে থেকে বন্দরের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আমরা সব সময় চাই বন্দর নিরাপদে থাকুক। তাই আমরা আরও কিছু রাসায়নিক পণ্য ধ্বংসের উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে পণ্যগুলো বন্দর থেকে সরিয়ে ধ্বংস করার জন্য লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

হায়দার বলেন, রাসায়নিক পণ্য নিলামে উঠলে বিডারদের (ক্রেতাদের) আগ্রহ থাকে। কিন্তু এসব পণ্য কেনার আগে বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি কিছু শর্তও থাকে। তাই ক্রেতারা এসব ঝামেলা পোহাতে চান না, পণ্যগুলোও অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকে। আমাদেরকেও বার বার নিলামের ব্যবস্থা করতে হয়। আমরাও রাসায়নিক পণ্য নিয়ে ঝামেলায় পড়ি।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে বিভিন্ন শেড ও ইয়ার্ডে পড়ে আছে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পণ্য। বিপজ্জনক হওয়ায় এসব পণ্যের মাধ্যমে যেকোন সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা এসব রাসায়নিক পণ্যগুলো পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে বন্দরে ঝুঁকি কমাতে ও জায়গা খালি করতে ১৫২ কেজি সালফিউরিক এসিড, এক ব্যাগ টেক্সটাইল কেমিক্যাল, ৭৬২ ব্যাগ এলুমিনিয়াম পাউডার ও ৮০ ড্রাম সাইক্লো হেক্সানন পণ্য নিলামে তুলছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। আগামী ২ ডিসেম্বর এসব পণ্যের নিলাম হওয়ার তারিখ রয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের উপ-কমিশনার।

পড়ুন : বাংলাদেশকে বিনিয়োগের শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন