রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও এই দামে বিক্রির নজির পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও ১ হাজার ৮০০ টাকা, কোথাও ২ হাজার টাকা, আবার কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শুধু বাড়তি দাম নয়, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘সিলিন্ডার নেই’ অজুহাতও। রোববার সকালে রাজধানীর আজিমপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সিলিন্ডার গ্যাসের খুচরা দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। যেসব দোকানে অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়, সেখানেও অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি গ্যাস।
আজিমপুরের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, ‘সিলিন্ডার দেওয়া যাবে, তবে ২ হাজার ৫০০ টাকা পড়বে। নতুন বোতলসহ কিনলে ৪ হাজার টাকা দিতে হবে।’
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন এলপিজি-সংক্রান্ত গ্রুপেও বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রি ও সংকটের নানা চিত্র উঠে এসেছে।
‘বাংলাদেশ এলপিজি সিলিন্ডার এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট গ্রুপ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে সিলিন্ডার বিক্রির তথ্য দেন বিক্রেতারা। ক্রেতারাও নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সেখানে সুমাইয়া ইসলাম নামের একজন লিখেছেন, ‘দেশটা আসলে যাচ্ছে কোথায়? আজকে বসুন্ধরার ২ টা এলপি গ্যাস নিয়ে আসলাম ৪ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে।’
‘১টি ২ হাজার ৪৫০ টাকা করে, চিন্তা করেন। যেই গ্যাস ক্রয় করতাম ১২০০/১৪০০ টাকা, আজ সেই গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া। আমরা সাধারণ মানুষ কী করবো? আমাদের কি মেরে ফেলতে চান? না কি বাংলাদেশের জন্মগ্রহণ করে ভুল করে ফেলছি? এই দেশের মানুষ শেষ হয়ে যাবে দেইখেন! আমি বলি আমাদের ওপর অন্যায়-জুলুম করা হচ্ছে।’ যোগ করেন তিনি।
বাবু মিয়া নামের একজন ওই গ্রুপে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ভিডিওতে মজার ছলে একটি বাংলা গান জুড়ে দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘২ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস নিয়ে যাইতেছি।’
এদিকে ‘শেখ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি পেজ থেকে এলপিজি সিলিন্ডার বহনকারী গাড়ির ছবি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, ‘কী এক অবস্থা, ডিপোতে নাকি মাল নাই। গাড়ি পাঠাইলাম ভোরে, মাত্র আসলো। এমনি কী ব্যবসা চলে না কিরে ভাই। আমার মতো কার এই অবস্থা কমেন্ট করেন কিন্তু।’
পরে ক্রেতা সেজে ওই ফেসবুক পেজে থাকা মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে বিক্রেতা রাকিব বলেন, ‘সিলিন্ডার আছে, তবে কম। ২ হাজার টাকা চলতেছে। নরসিংদী থেকে নিতে হবে।’
‘৬৪ জেলা এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর অ্যাসোসিয়েশন’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে মো. রাসেল পোস্ট করেছেন, ‘১২ কেজি একটা সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাইলে সাধারণ মানুষ কীভাবে কিনবে? সরকারের কাছে একটা দাবি, দ্রুত খরচা বাজার নিয়ন্ত্রণ করুন।’
অন্যদিকে ‘এলপি গ্যাসের বাজার’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে পাওয়া এক খুচরা ব্যবসায়ীর মুঠোফোন নম্বরে ক্রেতা পরিচয়ে যোগাযোগ করা হয়। সাতক্ষীরার ওই ব্যবসায়ী মো. লাবিব বলেন, ‘গ্যাস আছে। আমরা ১ হাজার ৮০০ টাকা করে বিক্রি করতেছি। ওমেরা, আই গ্যাস, ফ্রেশ এগুলো আছে। অনেক বেশি নেই, টুকটাক আছে, বিক্রি করা যাচ্ছে। ডিলার পয়েন্ট কাছে তো — শহরের পাশেই। এজন্য আমরা পাই। গ্রাম-গঞ্জের কী অবস্থা বলতে পারবো না।’
আমদানিতে ঘাটতি নেই, তাহলে সংকট কোথায়?
বাজারের এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ও খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—দুই মাসেই দেশে এলপিজির আমদানি পর্যাপ্ত ছিল। ফলে আমদানির ঘাটতির কারণে বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিইআরসি জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন। আগস্টে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। সেই হিসাবে চাহিদার তুলনায় দেশে এলপি গ্যাসের সংকট নেই।
তাহলে আমদানি পর্যাপ্ত থাকার পরও বাজারে কেন সিলিন্ডার মিলছে না এবং মিললেও কেন সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
আমদানিকারকদের বিক্রির হিসাব চেয়েছে বিইআরসি
বাজার পরিস্থিতির মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়ে ১২টি এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। শনিবার (৩ অক্টোবর) ইস্যু করা ওই চিঠিতে পরদিন অর্থাৎ রোববার (৪ অক্টোবর) হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাওয়া আমদানির তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, রোববার তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দেশজুড়ে অভিযান, জরিমানা ৩৯ প্রতিষ্ঠানকে
সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ তদারকি চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকাসহ দেশের ১৬ জেলায় ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। অধিদপ্তরের ২৩টি দল একযোগে এই অভিযান পরিচালনা করে। নানা অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, গ্যাস সিলিন্ডারের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় ঠেকাতে এ তদারকি চালানো হয়।
অভিযানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, সিলিন্ডারের নিরাপত্তা বিধি মানা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হয়।
একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিক মজুত এবং সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
গ্যাস সিলিন্ডার কেনার আগে ওজন, সিল, মেয়াদ ও দৃশ্যমান ত্রুটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। পাশাপাশি মূল্যতালিকা যাচাই এবং কেনার সময় রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রিতে কোনো অনিয়ম দেখা গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১-এ অভিযোগ জানানো যাবে। বাজারে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা গতকাল শনিবারও অফিস করেছি। ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছি। তারা সেপ্টেম্বরে কী পরিমাণ এলপিজি বিক্রি করেছে জানতে চেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মিনিস্ট্রি কাজ করছে। জেলা পর্যায় পর্যন্ত তদারকি করা হচ্ছে। আজ নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। এরপর আরও কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে।’


