চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে আজ শুরু হচ্ছে চলতি বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা। সোমবার (৫ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।
প্রথা অনুযায়ী, প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার থেকে শুরু হয় নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা। আজ বিকেল সাড়ে ৩টায় চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কারজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে।
এরপর মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞান, বুধবার রসায়নবিদ্যা, বৃহস্পতিবার সাহিত্য এবং শুক্রবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। এ ছাড়া আগামী ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।
প্রতিবছরের মতো এবারও ছয়টি বিভাগে ছয় দিন ধরে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। চিকিৎসাশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিদ্যা, সাহিত্য ও অর্থনীতির নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হবে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে। আর শান্তিতে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে।
১০০ বছরের বেশি সময় ধরে নোবেল পুরস্কার বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক ও মূল্যবান পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সুইডিশ বিজ্ঞানী ও শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের নামে এবং তার রেখে যাওয়া অর্থ থেকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
আলফ্রেড নোবেল ছিলেন ডিনামাইটের উদ্ভাবক। তার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। তার উইলে পাঁচটি বিষয়ে পুরস্কারের কথা উল্লেখ থাকলেও অর্থনীতিতে পুরস্কার দেওয়ার কোনো উল্লেখ ছিল না।
১৯৬৮ সালে দ্য ব্যাংক অব সুইডেনের নেওয়া একটি বিশেষ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অর্থনীতিতে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা আসে। এরপর থেকে অর্থনীতির পুরস্কারও নোবেলের অন্যান্য পুরস্কারের মতো একই সময়ে ঘোষণা ও প্রদান করা হচ্ছে। এ পুরস্কারকে ‘বিকল্প নোবেল পুরস্কার’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে।
আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্টকহোম ও অসলোতে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। প্রতিটি বিভাগের বিজয়ী পাবেন ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রাউনের চেক (প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা), একটি মানপত্র ও একটি স্বর্ণপদক।
কোনো বিভাগে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেলে নির্ধারিত অর্থ তাদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে।
বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, নোবেল পুরস্কার ও এর প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড নোবেলকে ঘিরে রয়েছে নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারাবন্দি অবস্থায় পুরস্কার পাওয়া থেকে শুরু করে সর্বকনিষ্ঠ ও সবচেয়ে বেশি বয়সী বিজয়ী—নোবেল পুরস্কার নিয়ে জানা যাক পাঁচ তথ্য।
১. কারাবন্দি অবস্থায় নোবেল
১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অসলোতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। ১৯৩৬ সালে জার্মান সাংবাদিক ও শান্তিবাদী কার্ল ফন অসিয়েটস্কি নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটক ছিলেন।
১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সময় মিয়ানমারের বিরোধী নেত্রী অং সান সু চি গৃহবন্দি ছিলেন। সামরিক জান্তা তাঁকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিলেও দেশে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা থাকায় তিনি পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি।
চীনা ভিন্নমতাবলম্বী লিউ শিয়াওবো ২০১০ সালে কারাগারে ছিলেন। তাঁর পুরস্কার যেখানে রাখা হয়েছিল, সেখানে তাঁর জন্য একটি চেয়ার খালি রাখা হয়। ২০২২ সালে বেলারুশের মানবাধিকারকর্মী আলেস বিলিয়াতস্কি কারাগারে থাকায় তাঁর স্ত্রী নাতালিয়া পিনচুক তাঁর হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন। আর ২০২৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া ইরানের কর্মী নার্গেস মোহাম্মাদি পুরস্কার দেওয়ার সময় দেশটির এভিন কারাগারে আটক ছিলেন।
২. সর্বকনিষ্ঠ ও সবচেয়ে বেশি বয়সী বিজয়ী
নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী বিজয়ী পাকিস্তানের মানবাধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই। ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি নোবেল পুরস্কার পান।
এর আগে সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পাওয়া ব্যক্তি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার লরেন্স ব্র্যাগ। ১৯১৫ সালে ২৫ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান তিনি। যে গবেষণার জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেটি তিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে করেছিলেন।
ইরাকের নাদিয়া মুরাদকেও ২০১৮ সালে ২৫ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। ইয়াজিদি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পক্ষে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ পুরস্কার পান।
অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল পাওয়া ব্যক্তি হলেন মার্কিন নাগরিক জন গুডএনাফ। ২০১৯ সালে ৯৭ বছর বয়সে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। স্মার্টফোন ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিয়ে কাজের জন্য তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
এর এক বছর আগে ২০১৮ সালে তাঁর দেশের আর্থার অ্যাশকিন ৯৬ বছর বয়সে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।
৩. মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার
১৯৭৪ সাল থেকে নোবেল ফাউন্ডেশনের বিধিতে কোনো ব্যক্তিকে মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে পুরস্কার বিজয়ীর নাম অক্টোবর মাসে ঘোষণা হওয়ার পর ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আগে তিনি মারা গেলে পুরস্কার দেওয়ার বিধান রয়েছে।
এই নিয়ম চালুর আগে মাত্র দুজন ব্যক্তি মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁদের একজন সুইডেনের নাগরিক ও জাতিসংঘের মহাসচিব দাগ হামারশোল্ড। ১৯৬১ সালে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই বছর তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।
আরেকজন ছিলেন সুইডিশ কবি এরিক অ্যাক্সেল কার্লফেল্ট। ১৯৩১ সালে তাঁকে মরণোত্তর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
২০১১ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের জন্য কানাডার রালফ স্টেইনম্যানকে নির্বাচিত করে কমিটি। তবে কমিটি জানত না যে পুরস্কার ঘোষণার মাত্র তিন দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। পরে নোবেল ফাউন্ডেশন তাঁকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
৪. নারী নোবেল বিজয়ী
১৯০১ সাল থেকে দেওয়া ৬৩৩টি নোবেল পুরস্কারের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ৬৮টি। অর্থাৎ মোট পুরস্কারের প্রায় ১০ শতাংশ নারীদের হাতে গেছে। তবে ২০২০-এর দশকের শুরু থেকে এ হার ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক বিভাগগুলোতে নারী নোবেল বিজয়ীদের প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে কম। নোবেল পুরস্কারের বিভিন্ন কমিটি নারী বিজ্ঞানীদের জন্য কোটা চালুর প্রস্তাব একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পরিবর্তে নারী বিজ্ঞানীদের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।
৫. কবি ছিলেন আলফ্রেড নোবেল
ইতিহাসে আলফ্রেড নোবেল সবচেয়ে বেশি পরিচিত ডিনামাইটের উদ্ভাবক হিসেবে। তবে ইংরেজি কবিতার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। নিজেও তিনি সারা জীবন কবিতা লিখেছেন। কখনও মাতৃভাষা সুইডিশে লিখলেও তাঁর অধিকাংশ কবিতা ছিল ইংরেজিতে।
১৮৬২ সালে ২৯ বছর বয়সে এবং নিজের সাহিত্যিক প্রতিভা নিয়ে সন্দিহান থাকা অবস্থায় এক তরুণীকে ফরাসি ভাষায় লেখা একটি চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘পদার্থবিজ্ঞানই আমার ক্ষেত্র, লেখালেখি নয়।’
পড়ুন : ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, বোমারু বিমান সরাল যুক্তরাষ্ট্র
সা/


