আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের আশা করছে নির্বাচন কমিশন। তবে ভোটার হিসেবে নারীদের উপস্থিতি বাড়লেও প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সংখ্যা কম থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তাঁর মতে, সামাজিক সংস্কৃতি ও প্রচলিত বিশ্বাস এখনো নারীদের নির্বাচনি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
সিইসি বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে নারীর অংশগ্রহণ। তবে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।’ এ জন্য বড় পরিসরে প্রচারাভিযান পরিচালনা এবং তথ্যনির্ভর নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত এক পর্যালোচনা কর্মশালায় এসব কথা বলেন সিইসি। নির্বাচন কমিশনের ইলেক্টোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ইটিআই) সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় কর্মশালাটি।
কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রস্তুত করা খসড়া ‘জেন্ডার সমতা কৌশল’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং সেটি চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া। নির্বাচনি ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালায় নারীসহ সব লিঙ্গের মানুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ বাংলাদেশ ও সংস্থাটির ‘ইউএন ইলেক্টোরাল প্রজেক্ট ব্যালট অ্যান্ড ড্রিপ’-এর সহায়তায় কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী ভোটারদের বিপুল অংশগ্রহণ হবে। তবে নারী প্রার্থী কম হবে।’ এর পেছনে সামাজিক সংস্কৃতি ও প্রচলিত বিশ্বাসকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
নারীদের নির্বাচনি অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সিইসি বলেন, ‘পরিবর্তন মানুষ সহজে চায় না। পরিবর্তন করতে গেলে আমরা ১০ বার ভাবি। এজন্য সচেতনতা প্রয়োজন, বড় ক্যাম্পেইন করতে হবে। জনগোষ্ঠীর অর্ধেককে বাইরে রেখে আমরা গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে পারব না। বিশ্বাসযোগ্য গণতন্ত্রের জন্য নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে পরিবর্তন আনা কঠিন। এজন্য বিশাল পরিসরে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। নারী অংশগ্রহণ বাড়াতে তথ্যনির্ভর নীতি প্রণয়ন করতে হবে।’
জাতিসংঘের ইউএন উইমেনের কান্ট্রি প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নারীদের যুক্ত করতে হলে তাদের আর্থিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বাধা দূর করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নারীদের যুক্ত হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকারে নারীদের জন্য সংরক্ষিত পদ রয়েছে। সেখানে ভালো করতে পারলে তারা জাতীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখার সুযোগ পান।’
তিনি বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে গত জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী কম ছিল। দলীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে প্রার্থীর সংখ্যাও বাড়বে।’
নারীদের রাজনৈতিক ও নির্বাচনি অংশগ্রহণের পথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্য ও অপতথ্যও বাধা হয়ে উঠতে পারে উল্লেখ করে এ ধরনের তথ্য বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে নারী ভোটারদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি নারী ভোটার ও প্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ এবং নারী প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’
নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমেদ বলেন, ‘দেশে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক আইন থাকলেও বাস্তবে নিরাপত্তা ও সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় নারীদের বৃহত্তর পরিসরে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসতে হলে সমস্যার গভীরে যেতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘পাঁচ তারকা হোটেলে বসে কোনো কৌশল নির্ধারণ করলে ফল পাওয়া যাবে না। সমস্যার গভীরে যেতে হবে, গ্রামে যেতে হবে।’
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নারীদের সুরক্ষায় দেশে শক্ত আইন রয়েছে। তবে নারীর অধিকার সুরক্ষায় শুধু আইন যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তন প্রয়োজন।


