ঝুঁকির মুখে হাজারীবাগের তরুণ প্রজন্ম: গড়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য মাদকের নেটওয়ার্ক

রাজধানীর হাজারীবাগ থানা এলাকা ঘিরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদক কারবারিদের একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বিশেষ করে হাজারীবাগের ‘গণকটুলি সিটি কলোনি’ এবং ‘কালুনগর’ এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাদকের ভয়াল অভয়ারণ্য। একাধিকবার আটক হলেও আইনি ফাঁকফোকর ও নেপথ্যের চক্রের সহায়তায় জামিনে বেরিয়ে এসে এরা পুনরায় পুরোনো ব্যবসায় লিপ্ত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদকের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, হাজারীবাগের মাদক কারবারের প্রধান ‘হেডকোয়ার্টার’ হয়ে উঠেছে গণকটুলি সিটি কলোনি। কলোনির ভেতরের অংশ এবং বাইরের প্রধান সড়কে দিন-রাত সমানতালে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা ও গাঁজা। কলোনির ভেতরে মাদক সিন্ডিকেটের মূলহোতা হিসেবে সক্রিয় রয়েছে আবু কালাম, সেলি এবং তার ছেলে ইয়াসিন। এছাড়া নেপথ্য গডফাদার হিসেবে নাম উঠে এসেছে শাবানা, রাশিদা ও রিপনের।

কলোনির শেষ মাথায় রাস্তার ওপর ২-৩ জন লাইনম্যানের সার্বক্ষণিক পাহারায় চলে বেচাকেনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেলেই সংকেত দেয় তারা। রাস্তার অপর পাশের একটি বসতঘরের জানালা এবং ইটের দেয়াল কেটে তৈরি করা বিশেষ ফুটো (হোল) দিয়ে চলে ইয়াবা ও গাঁজার দ্রুত হাতবদল। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা মুখোমুখি না হয়েই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লেনদেন সম্পন্ন করে।

অন্যদিকে কালুনগর এলাকায় বর্তমানে অন্তত ৪ থেকে ৫টি মাদকের হটস্পট সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ‘গোল্ডেন সিটি’ সংলগ্ন শেখ রাসেল সরকারি কলেজের পেছনের গলি। এই স্পটের মূল দায়িত্বে রয়েছে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী জুয়েল এবং তার স্ত্রী আফসানা। এই দম্পতি গড়ে তুলেছে বিশাল এক খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক। এলাকাটিতে খুচরা বিক্রেতা হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে রোকসানা, সিফাত, সজিব (ওলা), আপেল, হাতকাটা অনিক, সুজন, কালু ও রকি। পাশাপাশি পুরো চক্রের সহযোগী ও সোর্স হিসেবে সক্রিয় রয়েছে সিজান, সম্রাট ও সানি।

মাদকের এই অবাধ বিস্তারে চরম উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণকটুলি কলোনির এক প্রবীণ বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “পুলিশ মাঝেমধ্যেই অভিযান চালায়, দু-একজনকে ধরেও নিয়ে যায়। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কোনো অফিসার বা টিমকে আমরা কখনো এই এলাকায় অভিযান চালাতে দেখি না। সব দায় কি শুধু পুলিশের? মাদক অধিদপ্তরের কাজটা আসলে কী?”

কালুনগরের স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “পুলিশের তৎপরতায় মাঝে মাঝেই বিক্রি বন্ধ থাকে, কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা না থাকায় ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যায়। তারা কেন এই চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে ঝটিকা অভিযান চালায় না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।”

অনুসন্ধানের উঠে আসে এই চক্রের টিকে থাকার গল্প। কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হলে তাদের দ্রুত জামিনে বের করে আনতে কাজ করে একটি নির্দিষ্ট আইনি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী সিন্ডিকেট। জামিনে বের হয়েই তারা নাম পরিবর্তন বা স্পট সামান্য রদবদল করে পুনরায় একই ব্যবসায় নেমে পড়ে। তরুণ ও উঠতি বয়সের কিশোরদের লাইনম্যান হিসেবে ব্যবহার করায় মূল কারবারিরা অধিকাংশ সময় আড়ালেই থেকে যায়।

তবে স্থানীয় পুলিশের গতিশীল ভূমিকা ও কঠোর মনোভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাজারীবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোশারফ হোসেন মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “মাদকের ব্যাপারে আমরা সবসময় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। হাজারীবাগকে মাদকমুক্ত করতে আমাদের নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। তরুণ সমাজকে রক্ষায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামনে আরও কঠোর থেকে কঠোরতর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

অন্যদিকে হাজারীবাগ এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান না থাকা সংক্রান্ত স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অধিদপ্তরটির মহাপরিচালক হাসান মারুফ জানান, “মাদকের বিস্তার রোধে আমাদের জেলা ও আঞ্চলিক সার্কেলগুলো নিয়মিত কাজ করছে। হাজারীবাগের চিহ্নিত স্পটগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আশা করি দ্রুতই সেখানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা ও ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হবে।”

হাজারীবাগের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান চান সর্বস্তরের অধিবাসীরা।

পড়ুন : ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ, অনির্বাচিতদের হাতে যাচ্ছে ইউপি; বাড়ছে প্রশ্ন

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন