মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফারুক শেখের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি, অসদাচরণ ও মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নে বিট পুলিশিংয়ের দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিকে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
এ ঘটনায় উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের মো. ফিরোজ মিয়া মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে মোটরসাইকেল আরোহীকে থামিয়ে কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে দুই হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন গোপীনাথপুর মধ্যপাড়া গ্রামের আবুল কালাম নামে এক ব্যক্তি।
পুলিশ সুপার বরাবর দেওয়া ফিরোজ মিয়ার লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বিট পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এসআই ফারুক তাকে এবং তার ভাড়াটিয়া দোকানদার ইমন হোসেনকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছেন। স্থানীয় সাইদুল ইসলাম আকন্দের সঙ্গে যোগসাজশ করে তার ওয়ারিশি জমিতে থাকা দোকান উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ফিরোজের দাবি, ওই জমি নিয়ে আদালতে ১৪৪ ও ১৪৫ ধারার মামলা এবং স্থগিতাদেশ রয়েছে। এরপরও গত ৪ সেপ্টেম্বর এসআই ফারুক তাকে লেছড়াগঞ্জ বাজারে ডেকে দোকান ভেঙে দেওয়ার জন্য চাপ দেন এবং তা না করলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে এসআই ফারুক সাইদুল ইসলাম আকন্দকে সঙ্গে নিয়ে গোপীনাথপুর মজমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে থাকা ফিরোজের মুদি দোকানে যান। সেখানে ভাড়াটিয়া ইমন হোসেনকে দোকান থেকে বের হয়ে আসতে বলা হয়। একপর্যায়ে দোকানের মালামাল বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ফিরোজ। এতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি তার।
সর্বশেষ ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় এসআই ফারুক সাইদুল ইসলাম আকন্দকে নিয়ে ওই দোকানে গিয়ে ‘আকন্দ ফার্মেসী’ লেখা একটি ফেস্টুন লাগিয়ে দেন এবং দোকানে তালা লাগিয়ে চাবি সাইদুলকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় হরিরামপুর থানার ওসি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশে দোকানে তালা দেওয়া হয়েছে—এমন কথা বলা হয় বলেও অভিযোগ করেন ফিরোজ।
ফিরোজ মিয়া বলেন, “বিভিন্ন সময়ে এসআই ফারুক আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। মামলার দায়িত্বে না থাকলেও পুলিশি ক্ষমতার ব্যবহার করে এবং আদালতের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে আমাকে হয়রানি করা হয়েছে।”
গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আলমগীর হোসেন অভিযোগ করে বলেন, মোটরসাইকেল থামিয়ে কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে স্থানীয়দের হয়রানি করা হয় এবং পরে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে অসন্তোষ আছে। ১০০-২০০ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।”
গোপীনাথপুর মধ্যপাড়া গ্রামের আবুল কালাম অভিযোগ করে বলেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে মধ্যপাড়া কালিখোলা ব্রিজ এলাকায় তাকে মোটরসাইকেলসহ থামানো হয়। কাগজপত্র বাড়িতে থাকায় তিনি পরে দেখানোর কথা বললে মোটরসাইকেলটি চোরাই বলে সন্দেহ করা হয় বলে দাবি তার। পরে কাগজপত্র দেখানোর পরও বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করে তাকে ভয় দেখানো হয় এবং একপর্যায়ে স্থানীয় এক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে দুই হাজার টাকা দিয়ে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন বলে জানান।
এদিকে জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে গোপীনাথপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস বলেন, বিষয়টি আদালতে চলমান বলে তিনি শুনেছেন। তার ভাষ্য, “এক পক্ষের সাইনবোর্ড, পরে আরেক পক্ষের সাইনবোর্ড—এভাবে বারবার পরিবর্তন হচ্ছে। দোকানে কখন কে তালা দিচ্ছে, আবার কে খুলছে এবং তালার চাবি কার কাছে থাকছে—এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার।”
গোপীনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন মোল্লা লাভলু বলেন, ফিরোজ ও সাইদুল আত্মীয়। জমি নিয়ে বিরোধটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তিনি জানান, মামলা চলমান থাকায় আদালতের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ জায়গায় কেউ যেন অনধিকার প্রবেশ না করে, সে বিষয়ে থানার কর্মকর্তাদের বলা হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই মো. ফারুক শেখ। তিনি বলেন, “অন্যের সম্পত্তিতে আমরা তালা মারব কেন? তারাই তালা দিয়েছে। ওই দোকানে একটি সাইনবোর্ড ছিল, পরে কে যেন সেটি খুলে ফেলে। ওসি সাহেব বলেছেন, মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তালা মারা থাকবে।” এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, বিরোধপূর্ণ ওই জায়গার আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়টি এএসআই মাসুদ ও এএসআই মো. মোরশেদ আলম দেখছেন।
এএসআই মাসুদ বলেন, তিনি দুই দিনের ছুটিতে রয়েছেন এবং এএসআই মোরশেদ আলম সাক্ষ্যগ্রহণের কাজে বাইরে আছেন। এ সময় এসআই ফারুক কেন বা কার নির্দেশে সেখানে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি বলতে পারবেন না।
লিখিত অভিযোগের বিষয়ে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মহরম আলী বলেন, “অভিযোগ আমরা পেলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পড়ুন : নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন ভোলার তিন লাখ জেলে, অর্থনৈতিক সংকটে পরিবারগুলো
সা/


