মধ্যরাত থেকে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরু, চড়া দামে দুশ্চিন্তায় জেলেরা

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও ইলিশের প্রজননকাল নির্বিঘ্ন করতে বুধবার (৭ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টা থেকে শুরু হচ্ছে সাগর ও মোহনায় ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা সামনে রেখে গভীর সমুদ্র থেকে মাছ নিয়ে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ফিরছে শত শত মাছ ধরার ট্রলার। এতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটে বেড়েছে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ।

অবরোধকে সামনে রেখে মাছধরা ট্রলার গুলো মাছ বিক্রির জন্য পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটে একের পর ভিড়তে দেখা গেছে। ঘাট এলাকায় মাছের হাঁকডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা এবং শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তবে পূর্বের তুলনায় মাছের দাম আরও চড়া বলে জানিয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

পাথরঘাটা উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৭ অক্টোবর দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ ও ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে মা ইলিশ সংরক্ষণে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার, পরিবহন, মজুদ বা বাজারজাত করলে আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী এক থেকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার কারণে পাথরঘাটার প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বিএফডিসিসহ উপজেলার বিভিন্ন মৎস্য আড়ৎ ২২ দিন কার্যত বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়বেন হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবী। বন্ধ হয়ে যাবে উপজেলার সবকটি বরফকল ও মাছসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও।

গতকাল বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) ঘাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে সারি সারি ট্রলার বাঁধা। সেসব ট্রলার থেকে ঘাটের শ্রমিকরা মাছ তুলছেন।

এফবি সাফওয়ান ট্রলারের মাঝি নাসির উদ্দিন এবং জেলে জসিম, মনির, ওসমান, জব্বারসহ সকল জেলের একটাই কথা—সাগরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার পর নিষেধাজ্ঞা, অথচ মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। হতাশার মধ্যে নতুন দিনের আশায় মাছ পাওয়ার প্রতীক্ষায় প্রতিদিনই তারা দাপিয়ে বেড়ান সাগর, নদী ও সাগর মোহনায়।

তারা বলেন, সপ্তাহ, মাস, বছর পেরিয়ে গেলেও গত চার-পাঁচ বছর ধরে নদীতে মাছ না পাওয়ায় জায়গা-জমি যার যেটুকু ছিল, সব বিক্রি করে এখন নিঃস্ব। ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে জেলে পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। অনেকের ঘরে বৃদ্ধ মা-বাবা ও ছোট শিশুদের চিকিৎসা তো দূরের কথা, দুমুঠো ভাত দেওয়াই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এক কথায় তারা বলেন, মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞায় মূলত সাধারণ জেলেদের কোনো উপকার হয় না।

ছয়টি বড় ট্রলারের মালিক ও পরিচালক মোস্তফা কামাল আলম বলেন, ‘এতগুলো ট্রলার চালিয়েও লাভের মুখ দেখতে পারি না। গত ছয় বছরে কোটি কোটি টাকা দেনা হয়ে গেছি। ট্রলার বিক্রি করতে চাইলেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। কী করা যায়, এ নিয়ে আমরা দিশেহারা।’
পাথরঘাটার মৎস্য ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন পাথরঘাটার বিএফডিসিসহ উপজেলার অধিকাংশ মৎস্য আড়ৎ বন্ধ থাকবে। এতে জেলে, শ্রমিক ও মাছের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বেকার হয়ে পড়বেন। তবে জেলেদের জন্য সরকারি প্রণোদনা সঠিক সময়ে ও সঠিকভাবে বিতরণ করা হলে এ সময়ের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে।’

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণ করা গেলে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন বাড়বে। এর সুফল জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাই ভোগ করবেন। তাই অধিকাংশ জেলেই এখন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন এবং অবরোধের সময় মাছ শিকার থেকে বিরত থাকেন।

তিনি আরও বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের যে ২৫ কেজি চাল দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। জেলেদের সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক সহায়তাও দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বছরে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সময়ে একবার নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।’

পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাসিবুর হক বলেন, বুধবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে আগামী ২৯ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত সাগর ও মোহনায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এ সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন ও মজুদের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে উপজেলা মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ঘাটে লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে। আগামী ২২ দিন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে। নদী ও সাগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও অভিযানে থাকবেন।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ফলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ময়মনসিংহে হত্যা মামলায় তিন ভাইয়ের মৃত্যুদন্ড, ১০ জনের যাবজ্জীবন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন