ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় মাফিয়ার হাতে বিক্রি, মুক্তিপণ দিয়েও মেলেনি মুক্তি

ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মেহেরপুরের গাংনীর চার যুবককে লিবিয়ায় নিয়ে মাফিয়া চক্রের হাতে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক দালালের বিরুদ্ধে।
সেখানে অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে তাঁদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে দাবি করা হতো লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। স্বজনদের কেউ বসতভিটা, কেউ চাষের জমি বিক্রি করে টাকা পাঠিয়েও পাননি কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। বরং টাকা দেওয়ার পরও বাড়তে থাকে মুক্তিপণের দাবি। একপর্যায়ে মাফিয়া চক্রের কবল থেকে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন ভুক্তভোগীদের কয়েকজন। দেশে ফিরে মানব পাচারের অভিযোগে মামলা করলেও তদন্তের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন গাংনীর মামুন, সামসুল, তুহিন ও বাদশা। তাঁদের অভিযোগ, গাংনীর এলাঙ্গী গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য, রায়পুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইতালি প্রবাসী জব্বার তাঁদের প্রত্যেককে ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালি নেওয়ার আশ্বাস দেন। শর্ত ছিল, বিদেশে পৌঁছানোর পর টাকা পরিশোধের সুযোগ থাকবে। উন্নত জীবনের আশায় সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কা হয়ে লিবিয়ায় পাড়ি জমান তাঁরা। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরই বদলে যায় পরিস্থিতি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের মাফিয়া চক্রের হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর একটি অন্ধকার ঘরে তাঁদেরসহ বিভিন্ন এলাকার ৬০ জনের বেশি বাংলাদেশিকে আটকে রাখা হয়। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলত নির্যাতন। কখনো উল্টো করে ঝুলিয়ে লাঠি দিয়ে পেটানো হতো, আবার কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হতো। নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পাঠানো হতো পরিবারের কাছে। পরে ফোন করে দাবি করা হতো মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো সারাদিনে মাত্র একটি রুটি ও ২৫০ মিলিলিটার পানি।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, টাকা পাঠানোর পরও তাঁদের স্বজনদের মুক্তি দেওয়া হয়নি। বরং নতুন করে টাকা দাবি করে নির্যাতন অব্যাহত রাখা হতো। সন্তান ও স্বামীকে বাঁচাতে অনেক পরিবারকে শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে। কেউ বসতবাড়ি বিক্রি করেছেন, কেউ বিক্রি করেছেন চাষের জমি। আবার কেউ এনজিও ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে টাকা পাঠিয়েছেন। ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে এসব টাকা লেনদেনের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদের স্বজনেরা। এমনকি দালাল জব্বারের স্ত্রীর কাছেও টাকা দেওয়ার দাবি করেছেন তাঁরা।

সামসুলের স্ত্রী পারভীনা আক্তার জানান, ১৪ লাখ টাকার চুক্তিতে তাঁর স্বামীকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁর। এরপর স্বামীকে উল্টো করে ঝুলিয়ে নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হয় পরিবারের কাছে। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যা করে সাগরে ফেলে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। স্বামীর জীবন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত বসতবাড়ি ও জমি বিক্রি করেন পারভীনা। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও বিকাশ নম্বরে ধাপে ধাপে পাঠান মোট ৪৬ লাখ টাকা। দীর্ঘ নির্যাতনের পর ২০২৫ সালের মে মাসে পালিয়ে ইতালিতে পৌঁছাতে সক্ষম হন সামসুল।

একপর্যায়ে মাফিয়া চক্রের কবল থেকে পালানোর সুযোগ পান ভুক্তভোগীদের কয়েকজন। লিবিয়ার এক মসজিদের ইমামের সহায়তায় তাঁদের কেউ কেউ দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে এবার দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেন তাঁরা। মামুন ও সামসুলের পরিবারের পক্ষ থেকে দালাল জব্বার, তাঁর স্ত্রী ও ভাইসহ ছয়জনকে আসামি করে মেহেরপুর আদালতে মানব পাচার আইনে মামলা করা হয়।

মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় গাংনী থানার এলাঙ্গী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই অতুল জোয়ার্দ্দারকে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তদন্তের সময় দালাল জব্বারের সঙ্গে অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে তাঁর স্ত্রী ও ভাইসহ চারজনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পরে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও অভিযুক্তদের ভূমিকা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দালাল জব্বারের স্ত্রী ও ছোট ভাই। তাঁদের দাবি, তাঁরা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত নন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। জব্বারের ছোট ভাইয়ের বক্তব্য, তাঁর ভাইয়ের মাধ্যমে কেউ লিবিয়ায় গিয়ে থাকলেও তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। তাঁর দাবি, তাঁরা জড়িত থাকলে আইনের শাস্তি মেনে নেবেন।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অতুল জোয়ার্দ্দার বলেন, তদন্তে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে মানব পাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, মেহেরপুর জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত না হলে বাদীপক্ষের আদালতে নারাজি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে জিম্মি, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ শুধু মানব পাচারের ভয়াবহ চিত্রই সামনে আনেনি, দেশে ফিরে বিচার চাইতে গিয়ে ভুক্তভোগীরা কতটা আইনি জটিলতার মুখে পড়ছেন, সেই প্রশ্নও তুলেছে। সর্বস্ব হারানো এসব যুবক ও তাঁদের পরিবারের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক। তাঁদের প্রত্যাশা, বিদেশে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে আর কোনো পরিবার যেন এমন সর্বনাশের শিকার না হয়।

পড়ুন : রাজধানীর বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে বাড়ল সবজি, মুরগি ও মাছের দাম

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন