দিল্লির জন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নির্ধারিত বিক্ষোভের ঠিক আগে শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে বিমানে অভিযান চালিয়ে দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। মুম্বাই থেকে আসা বিমানটি দিল্লির বিমানবন্দরে অবতরণের পরই বিমানে ঢুকে পুলিশ সদস্যরা তাকে আটক করেন। বিমান চালুরত বা পার্কিং অবস্থায় ভেতরের এমন অভিযানে তাৎক্ষণিক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যার পুরোটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে সরাসরি সম্প্রচার (লাইভ) করেন দীপকে।
টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভির বরাতে জানা যায়, সরাসরি প্রচারিত সেই ভিডিওতে দেখা যায়—দিল্লি পুলিশের সদস্যরা বিমানে প্রবেশ করে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলটির অন্য দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করছেন।
বিমানের ভেতরে তৈরি হওয়া হট্টগোলের মধ্যে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সিজেপির সদস্যরা। তাদের বিমান থেকে সাধারণ যাত্রীদের মতো নেমে আসা পর্যন্ত কেন অপেক্ষা করা হলো না, সে বিষয়ে তারা প্রতিবাদ জানান। ভিডিওতে নারী পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে অভিজিৎ দীপকেকে বলতে শোনা যায়, “আমরা বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতেন। আসুন, আমাদের গ্রেপ্তার করুন। আমরা ভয় পাই না।” পরবর্তীতে বিমানবন্দর থেকেই তিন নেতাকে অজ্ঞাত কোনো স্থানে সরিয়ে নেয় পুলিশ।
এর আগে শনিবার সকালে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে মুম্বাই থেকে দিল্লির পথ ধরেছিলেন দীপকে।
বিমান থেকে সরাসরি এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে “স্বৈরাচারী কায়দায় আটক” বলে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বার্তা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
দলটির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, “দিল্লি পুলিশের এই পূর্বপরিকল্পিত বাধার মূল উদ্দেশ্য হলো আজকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনস্থলে পৌঁছানোর আগেই দলের মূল নেতৃত্বকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা। মুক্তভাবে চলাচলের অধিকারের এই স্পষ্ট লঙ্ঘনের জন্য সিজেপি তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং অবিলম্বে দীপকে, দাস ও রাঙ্কার অনতিবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছে।”
এদিকে মূল আন্দোলনের আগেই রাজপথের সুর থমকে দিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। একই দিন সকালে সিজেপির আইনবিষয়ক সেলের প্রধান রত্না সিং এবং জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে নিজ নিজ বাসভবন থেকে আটক করা হয়, যেন তারা প্রস্তাবিত ওই বিক্ষোভে শরিক হতে না পারেন। এছাড়া, রাজধানীতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সন্দেহভাজন হিসেবে গত রাতজুড়ে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
উল্লেখ্য, পর্যাপ্ত সময় পূর্বে লিখিত আবেদনের অনুমোদন চাওয়া হয়নি—এই কারণ দেখিয়ে গত শুক্রবারই সিজেপির এই কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল দিল্লি পুলিশ। আন্দোলন দমাতে পুরো দিল্লি শহরজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদর বিছানো হয়েছে। যাতায়াত নিরবচ্ছিন্ন রাখা ঠেকাতে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে শহরের ৪৫টি মেট্রো স্টেশন এবং বাতিল করা হয়েছে কয়েকশ দূরপাল্লার ও লোকাল ট্রেন। সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে রাজধানীজুড়ে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) ২০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
এর আগে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আজ শনিবার সকাল ১০টায় নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সেই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল জনপ্রিয় ভারতীয় ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সার ধ্রুব রাঠির। তবে বিক্ষোভ শুরুর আগেই শনিবার ভোরে রাজধানীসংলগ্ন শহর গুরুগ্রাম থেকে তাকে আটক করেছে পুলিশ।
সিজেপির এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় সাত স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলবৎ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে যন্তর মন্তরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগে শনিবার কনট প্লেস এলাকা থেকে অন্তত ১৫০ জনকে আটক করা হয়েছে। এর আগে শুক্রবার নয়াদিল্লি ও আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাতভর অভিযান চালিয়ে আরও প্রায় ১ হাজার মানুষকে আটক করেছে পুলিশ।
সিজেপির বিক্ষোভ কর্মসূচি ঠেকাতে নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। রাজধানীতে ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য এবং তিন শতাধিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা মোতায়েন করা হয়েছে। এমনকি আন্দোলনকারীদের আটক করার পর রাখার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ১২টি অস্থায়ী বন্দিশিবিরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
নির্ধারিত এই বিক্ষোভের জন্য পুলিশের কাছে আগে অনুমতি চেয়েছিল সিজেপি। কিন্তু প্রশাসনিক নিয়মকানুন, অতীতের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিপুল জনসমাগমের ফলে নিরাপত্তা ও যান চলাচলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা প্রকাশ করে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে দেয় পুলিশ। এর পাশাপাশি রাজধানীজুড়ে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারার আওতায় সব ধরনের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
দিল্লির এমন কঠোর ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিজেপির শীর্ষ সংগঠক অভিজিত দীপকে। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিবাদ শুরু হওয়ার আগেই মোদী পরাজয় মেনে নিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন এবং দিল্লিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা—এসব কোনো শক্তির পরিচয় নয়, বরং নিজের দেশের মানুষের কাছে ভীত এক নেতার লক্ষণ।”
পড়ুন : ধ্রুব রাঠিকে আটক করল গুরুগ্রাম পুলিশ, দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা
সা/


