বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন একপর্যায়ে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁর দীর্ঘ শাসন। সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি সামনে রেখেই এবার ভারতের তরুণদের আন্দোলন ঘিরে উঠছে প্রশ্ন—ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে শুরু হওয়া ক্ষোভ কি আরও বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেবে? নাকি কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ধরপাকড় ও রাজনৈতিক চাপের মুখে থেমে যাবে এই বিক্ষোভ?
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকে ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভের বড় কর্মসূচির আগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে দলটি। নেতাদের আটকের পরও দেশজুড়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
একই সময়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়; বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি আন্দোলনের নেতাদেরও আটক করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ আন্দোলনকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, নাকি ক্ষোভ আরও বাড়াবে—সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
বিমান থেকে ধারণ করা এক ভিডিও বার্তায় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, “জরুরি অবস্থার সময়ও ইন্দিরা গান্ধী এমনটা করেননি। পরিস্থিতি তার চেয়েও খারাপ। আমরা সবাই গ্রেপ্তার হওয়ার জন্য প্রস্তুত।”
দলটির নেতা সৌরভ দাসের অভিযোগ, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ একটি সাংবিধানিক আন্দোলন থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সিজেপির ভাষ্য, নেতাদের আটক, ব্যারিকেড, ইন্টারনেট বন্ধ ও ধরপাকড়ের মধ্যেও তাদের অবস্থানে পরিবর্তন আসবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাবে তারা।
এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং এতে বৈধ ভোটাররাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের একাংশের দাবি, এর ফলে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান, ভোটার তালিকা আরও নির্ভুল করতেই এই সংশোধন করা হচ্ছে। ফলে বিতর্কটি শুধু ভোটার তালিকার কারিগরি সংশোধনে সীমাবদ্ধ নেই; ভোটাধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সিজেপি মূলত তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ। ব্যঙ্গাত্মক পরিচয় নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে বেকারত্ব, পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং বিভিন্ন নাগরিক অসন্তোষকে সামনে এনে সংগঠনটি সক্রিয় হয়। অক্টোবরের শুরুতে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে তাদের কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রতিবাদ দমনে পুলিশ বলপ্রয়োগ করেছে এবং কয়েকজনকে আটক করেছে। এসব ঘটনার পর ১০ অক্টোবরের কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
দিল্লিতে কর্মসূচির আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা এমন পর্যায়ে নেওয়া হয় যে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং কয়েকটি রেল পরিষেবাও বাতিল করা হয়। নির্দিষ্ট এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। নিরাপত্তার এই কড়াকড়ি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত হয়েছে, “মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।”
আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও। তাঁর বক্তব্য, “এটা গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। ১০ তারিখে কেউ দিল্লি আসতে ভুলবেন না।” অন্যদিকে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকের নেতারাও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান নিয়েছেন। সংসদ থেকে রাষ্ট্রপতির বাসভবন পর্যন্ত পদযাত্রা এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচির কথাও সামনে এসেছে।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের তুলনা আসার কারণও এখানেই। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলন সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন ও প্রাণহানির পর বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলন বিস্তৃত হয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন।
তবে দুই দেশের পরিস্থিতি এক নয়। বাংলাদেশের আন্দোলনের পটভূমি, দাবির ধরন, রাজনৈতিক সমীকরণ ও ঘটনাপ্রবাহ ভারতের বর্তমান বিক্ষোভ থেকে আলাদা। ভারতের আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হবে, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কতটা বাড়বে, বিরোধী দলগুলো কতটা সক্রিয় ভূমিকা নেবে এবং কর্তৃপক্ষ কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবে—এসব বিষয়ই পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ মুহূর্তে ভারতের তরুণদের আন্দোলন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মতো পরিণতির দিকে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই। তবে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক, নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবি, নেতাদের আটক এবং বিক্ষোভ ঘিরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: আন্দোলন দমনের চেষ্টা কি ক্ষোভ প্রশমিত করবে, নাকি আরও বেশি মানুষকে রাজপথে নামার প্রেরণা জোগাবে?
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কোনো আন্দোলনের সূচনা আর তার চূড়ান্ত পরিণতি এক বিষয় নয়। ভারতের ক্ষেত্রেও এখন নজর থাকবে আন্দোলনের বিস্তার, জনসম্পৃক্ততা এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার ওপর। দিল্লির এই বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত কত দূর যাবে, তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত।


