চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) প্রশাসনিক জটিলতা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভের ২১তম দিনে এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম রাউজানস্থ ক্যাম্পাসে এসে সেই তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং পরবর্তীতে স্বীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেন।
এর আগে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলায় নবনিযুক্ত উপাচার্য ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পেরে এতদিন অনলাইনে দাপ্তরিক কাজকর্ম পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে সোমবার সকালে তালা ভেঙে তার অফিসে প্রবেশের ঘটনায় ক্যাম্পাসে নতুন করে থমথমে পরিবেশ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উপাচার্যের মন্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চুয়েটের এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট ও একাডেমিক অচলাবস্থার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে:
১. সাবেক উপাচার্যের অপসারণ ও অভাবনীয় গ্রহণযোগ্যতা:
গত বছরের ২৭ জুলাই দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সংক্ষিপ্ত সময়েই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের পৃষ্ঠপোষকতা, জমকালো ক্লাচারাল ফেস্ট আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের সুযোগ তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কারণ ছাড়া তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মানতে পারছেন না কেউ।
২. বহিরাগত উপাচার্য নিয়োগে আপত্তি:
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের উপেক্ষা করে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে উপাচার্য এনে বসানোকে চুয়েটের ভাবমূর্তি ও মর্যাদার জন্য ‘অবমাননাকর’ বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।
৩. নবনিযুক্ত ভিসির অতীত বিতর্ক:
নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলম চুয়েটের সাবেক ছাত্র হলেও দীর্ঘকাল ধরে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। তাছাড়া, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) প্রো-ভিসি থাকাকালীন ছাত্র সংঘর্ষ ও তিন মাস একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির থাকার প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে ও তৎকালীন উপাচার্যকে অপসারণ করেছিল।
সংকটের সূত্রপাত ও একাডেমিক স্থবিরতা:
উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্যকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, অবস্থান কর্মসূচি ও গণস্বাক্ষর অভিযান চালাচ্ছেন। একই দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশও কর্মবিরতি পালন করায় চুয়েটের সার্বিক প্রশাসনিক ও শিক্ষাকার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে গেছে।
চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম জানান, সিভিল, মেকানিক্যাল এবং পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অন্তত ৬টি বিভাগের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। আন্দোলন চলমান থাকায় নতুন পরীক্ষার সময়সূচি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সেশনজটের তীব্র শঙ্কায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ে নবনিযুক্ত উপাচার্য মন্তব্য করায় ক্ষোভ আরও বাড়ে এবং গত শনিবার শিক্ষার্থীরা তাকে প্রতীকী ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন করেন। তবুও সেশনজট ও শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দাবি না আদায় হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অনড় ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা চুয়েট ২০০৩ সালে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৩৭১ জন শিক্ষক এবং ৬ হাজার ৩৬৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।
পড়ুন : সৌদির রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলায় ২৪ বাংলাদেশি আহত
সা/


