চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে ঘরবাড়ি ও দেহ তল্লাশি করে মাদক না পেলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচয় দিয়ে মামলা দেয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে এক নারীর কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান শেষ করে তারা চলে যাওয়ার পরপরই টাকা নেয়ার জন্য ওই নারীকে ফোনে চাপ দিতে থাকে কয়েকজন ব্যক্তি। প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে ১০ হাজার টাকা নেয়া হয় বলে দাবি ওই নারীর।
ভুক্তভোগী নারী ফুলতারা বেগম জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের মিনিবাজার এলাকার আব্দুল হান্নানের স্ত্রী। এমনকি ওই নারীর সাথে ডিএনসির নাম করে দফায় দফায় টাকা চেয়ে চাপ দেয়ার একাধিক অডিও রেকর্ড এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। সেখানে শোনা যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা পরিচয়ে ওই ব্যক্তি বলেন, দ্রুত টাকার ব্যবস্থা করেন। এসময় ওই নারী জানান, আমি স্থানীয়ভাবে অনেক চাপে আছি এবং এক মাস ধরে মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি। এমনকি আমার বাড়িতে কোন মাদকও পাননি। আমি কোথা থেকে টাকা দিব?
আরেকটি অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, ওই ব্যক্তি বলেন, টাকা পেয়েছেন? তাড়াতাড়ি ম্যানেজ করেন। এসময় ওই মহিলা বলেন, টাকা ম্যানেজ করতে পারিনি। মাত্র ১০ হাজার ম্যানেজ করলাম। এটা নিয়েই মেনে নেন স্যার। এক মাস ধরে ব্যবসা বন্ধ, নিজেরাই না খেয়ে মরছি। এসব কথোকপথের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জন্য নাজিম নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি ১০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। এর আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষে টাকা দিতে একাধিকবার ওই নারীর সাথে যোগাযোগ করে স্থানীয় সোর্স মাসুদ ও নাজিম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বুধবার (০৭ অক্টোবর) রাতে ফুলতারার বাড়িতে অভিযানে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল। এসময় তারা পুরো বাড়ি, ঘর ও ওই নারীর দেহ তল্লাশি করে। এতে কিছুই পায়নি ডিএনসির অভিযান দল। পরে তারা ওই নারীর বাড়ি ত্যাগ করে। এরপরই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তি এবং নাজিম ও মাসুদ যোগাযোগ করে ফুলতারার সাথে। এসময় ৩০ হাজার টাকা না দিলে মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার হুশিয়ারী দেয়া হয় বলে ওই নারীর। পরে ১০ হাজার টাকা ডিএনসির নামে দেয় ওই নারী।
ফুলতারা বেগম বলেন, এক নারীকে দিয়ে কাপড়চোপড় খুলে আমার দেহ তল্লাশি করে। আমার ঘরের কোনাকুনি সবই দেখে। কিন্তু কোন মাদক পায়নি। তারা যাওয়ার পরপরই টাকার জন্য চাপ দেয় অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ও নাজিম। পরে নাজিমের হাতে ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। আমি আগে মাদক ব্যবসা করলেও স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যান ও গ্রাম পুলিশের নিষেধের কারনে গত এক মাস ধরে এসব কর্মকান্ড থেকে বিরত রয়েছি। এরপরেও মাদক না পেলেও আমার কাছে ভয় দেখিয়ে টাকা নিয়েছে তারা। তবে অভিযানের সময় কোন টাকাপয়সা চাইনি বলেও জানান তিনি।
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিবেশীরা জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকজন আসা মাত্রই পাশের বাড়িতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে ফুলতারা। তাকে ধরে মহিলা কনস্টেবল দেহ তল্লাশি করে। এমনকি ঘরবাড়িতেও তল্লাশি করে কোন মাদক পায়নি। পরে তারা চলে যায়। অভিযানের সময়েও সেখানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সোর্স মাসুদ সেখানে উপস্থিত ছিল।
এনিয়ে মাসুদের সাথে যোগাযোগ করা হলে মুঠোফোনে তিনি ঘটনা অস্বীকার করেন। এবিষয়ে কিছু জানা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অবশ্য তার কিছুক্ষণ পরই ফুলতারাকে ফোন দিয়ে, সাংবাদিক তথ্য দেয়ায় তার বিরাট ক্ষতি হবে বলে হুমকি দেন মাসুদ।
অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আরেক সোর্স ও টাকা গ্রহীতা নাজিমের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও বারবার পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দেন।
ঘটনার দিন অভিযানে উপস্থিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ফুলতারার বিরুদ্ধে পূর্বে মাদকের অভিযোগ থাকলেও গত ০৭ অক্টোবর তার বাড়ি ও দেহ তল্লাশি করে কোন মাদক পাওয়া যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই মাদক না পেয়ে ফেরত এসেছি আমরা। এছাড়াও তল্লাশির পুরো ভিডিও আমরা ধারন করেছি। তবে আমরা অভিযান শেষ করার পর ফুলতারা কে বা কাকে টাকা দিয়েছে তা আমাদের জানা নেই।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলে (ফুলতারার বাড়ি) অভিযানের সময় কোন মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করে অভিযানিক দল ফিরে এসেছে। আমাদের নাম করে কেউ অর্থ দাবি করলে, তা আমাদের জানা নেই। এমনকি তারা (মাসুদ ও নাজিম) আমাদের কেউই নয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান জানান, এবিষয়ে কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পড়ুন : মহেশপুর সীমান্তে নারী শিশুসহ আটক ৮


