ক্ষুধা দূর করার ক্ষেত্রে বিগত দুই দশকের ধারাবাহিকতার তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অগ্রগতির গতি আশঙ্কাজনকভাবে ধীর হয়ে পড়েছে। জার্মানির বার্লিনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ‘২০২৬ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই)’ বা বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের প্রতিবেদনে বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম নির্ধারিত হয়েছে। ১৯ দশমিক ২ স্কোর নিয়ে দেশের সার্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতি এখনো ‘মাঝারি’ বা ‘মধ্যম’ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রতিবেদনের ঐতিহাসিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ক্ষুধা কমানোর গতি ছিল অত্যন্ত দ্রুত। ওই সময়ে জিএইচআই স্কোর ৩৪ দশমিক ৬ (গুরুতর পর্যায়) থেকে কমে দাঁড়ায় ২০-এ, যা ৪২ শতাংশের বেশি উন্নতি নির্দেশ করে। কিন্তু ২০১৮ থেকে ২০২৬—এই ৮ বছরে স্কোরের উন্নতি হয়েছে মাত্র ০.৮ পয়েন্ট বা ৪ শতাংশ (২০ থেকে কমে ১৯.২)। অর্থাৎ পূর্বে যে গতিতে ক্ষুধা নিরসন হচ্ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তা ব্যাপকভাবে থমকে গেছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতিতে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতার অনুপাতে কম ওজন বা তীব্র অপুষ্টির (কৃশকায়) হার ২০১৮ সালের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে লাফিয়ে বেড়ে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ। সূচকের হিসাবে এটি ‘চরম উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে রয়েছে।
তবে অন্যান্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠিতে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্জন লক্ষণীয়। শিশুদের খর্বাকৃতি বা বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার হার ২০০০ সালে ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ থাকলেও ২০১৮ সালে তা কমে ২৯ দশমিক ৮ শতাংশে এবং সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় ২৪ শতাংশে নেমেছে। দীর্ঘমেয়াদে এই উন্নতির পেছনে মায়েদের শিক্ষার প্রচার, পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশনের উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া মোট জনসংখ্যার মধ্যে অপুষ্টির হার কমে ৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান মিশ্র। দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক গড় স্কোর ২৩ দশমিক ৫, যা পুরো অঞ্চলকে ‘গুরুতর’ মাত্রার ক্ষুধাভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে এই অঞ্চলে ১০ দশমিক ২ স্কোর নিয়ে ৫৩তম স্থানে থাকা শ্রীলঙ্কা এবং ১৪ দশমিক ৫ স্কোর নিয়ে ৭২তম স্থানে থাকা নেপাল বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত (১০০তম, স্কোর ২৪.১), পাকিস্তান (১০৬তম, স্কোর ২৫.৫) ও আফগানিস্তান (১০৮তম, স্কোর ২৮.৬) বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে ‘গুরুতর’ ক্ষুধা শ্রেণিতে অবস্থান করছে।
সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে উন্নতি হলেও বাংলাদেশে আঞ্চলিক বৈষম্য রয়ে গেছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শরণার্থীর চাপ এবং মানবিক সহায়তার ঘাটতির কারণে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের অঞ্চলগুলো এফএও (FAO) এবং ডব্লিউএফপি (WFP)-এর ‘ক্ষুধা ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, অপুষ্টির হার, শিশুদের তীব্র অপুষ্টি, খর্বাকৃতি এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার—এই চারটি মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের স্কোর নিরূপণ করা হয়।
পড়ুন : নেত্রকোনায় ৫ গুলিতে সাংবাদিক খুন, এলাকায় আতঙ্ক
সা/


