ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে হুতিরা। শুক্রবার রানওয়ের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি আঘাত হানে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে নতুন করে নিরাপত্তা সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-এরিয়ানি জানান, বিমানবন্দরে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্র দুটি উড্ডয়নের অপেক্ষায় থাকা একটি উড়োজাহাজ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে পড়েছিল। উড়োজাহাজটিতে থাকা সব যাত্রী ও ক্রু নিরাপদে রয়েছেন। তিনি এ হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন।
এডেন ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ফলে শহরটির বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর মাত্র এক দিন আগে এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এসব হামলার কারণে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতিদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি সামরিক সূত্রের বরাতে হুতিরা জানিয়েছে, এডেন প্রদেশের বদর ক্যাম্পে সৌদি বাহিনীর কমান্ড সদর দপ্তর এবং একটি অস্ত্রাগারে হামলা চালানো হয়েছে। তবে হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এডেনের বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সৌদি বাহিনীর স্থাপনায় হামলার দাবি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে লড়াই জোরদার হচ্ছে। সংঘাতের প্রভাব দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শহর, যোগাযোগব্যবস্থা ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার ওপর পড়ছে।
এদিকে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার রাজধানী সানা থেকে উত্তর-পূর্বে অবস্থিত মারিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে তারা অগ্রসর হয়েছে। সামরিক মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, বিমান সহায়তায় সরকারি বাহিনী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছে।
সরকারি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৩০ জনের বেশি হুতি যোদ্ধাকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস বা অকেজো করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
মারিব ইয়েমেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত অঞ্চল। এ অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার দাবি সংঘাতের সামরিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে লড়াইয়ের প্রকৃত অবস্থা এবং উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
ইয়েমেনের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্র তাইজ গভর্নরেটেও হুতিদের কয়েকটি বড় আক্রমণ প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী। তাদের দাবি, এসব সংঘর্ষে হুতিদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া তাইজ এলাকায় হুতিদের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ ড্রোন দলকে আটক করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিরা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ ঘিরে ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শহরটির দক্ষিণে এডেনগামী প্রধান সড়ক বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সঙ্গে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেসামরিক মানুষের চলাচল এবং ত্রাণ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের বহু মানুষ আগে থেকেই মানবিক সংকটে রয়েছেন। নতুন করে সংঘর্ষ বাড়লে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
শুক্রবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের আকাশে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এবং এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
সৌদি আরবের অভিযোগ, ইরান হুতিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে এবং দেশটির বিরুদ্ধে হামলা চালাতে উৎসাহ দিচ্ছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের দাবি, হুতিদের কোনো অভিযানে ইরানের ভূমিকা নেই। একই সঙ্গে হুতি ও রিয়াদের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাবও পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান।
ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরব ও ইরানের ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক উত্তেজনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একদিকে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে, অন্যদিকে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিরোধের কারণে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করলে দেশটিতে যুদ্ধ শুরু হয়। পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের সংঘাতে হস্তক্ষেপ করে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে লড়াই চলতে থাকে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে দেশটির অধিকাংশ এলাকায় বড় ধরনের লড়াই কমে আসে। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সংঘাতের মূল কারণগুলোর সমাধান হয়নি। ফলে বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে হুতিরা সৌদি আরবের বন্দর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ ঘোষণার পর উত্তেজনা আবারও বাড়ে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ চলাচল করে। ফলে সেখানে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনেও প্রভাব পড়তে পারে।
সেপ্টেম্বরে হুতিরা মোখা শহরে স্থল অভিযান চালিয়ে সরকারি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই মাসে পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের কয়েকটি এলাকা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপ দখলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এডেন বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, মারিব ও তাইজে সংঘর্ষ এবং সৌদি আরবের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনাগুলো ইয়েমেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরছে। সংঘাত অব্যাহত থাকলে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকট আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
পড়ুন:হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়াকে ট্রাম্পের বরখাস্ত
ইমি/


