শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিটি দিনই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও আনন্দময়। তবে এর মধ্যে উৎসবের প্রাণকেন্দ্র এবং সবচেয়ে মহিমান্বিত দিনটি হলো মহাঅষ্টমী। এই তিথিটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তদের উপবাস, পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন এবং নানা ঐতিহ্যবাহী আচারের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। মহাঅষ্টমীর মূল আকর্ষণ হলো কুমারী পূজা, যা গোটা দুর্গোৎসবকে এক অনন্য উচ্চতা ও আধ্যাত্মিক আমেজ প্রদান করে।
মহাঅষ্টমীর মাহাত্ম্য ও আচার-অনুষ্ঠান
ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন ও আমন্ত্রণের পর মহাসপ্তমীর পেরিয়ে মহাঅষ্টমীতে পূজার মূল পূর্ণতা আসে। শাস্ত্রমতে, এই দিনে দেবী দুর্গা উগ্রচণ্ডা, ভদ্রকালী ও মহামায়ারূপে আবির্ভূতা হন। ভোর থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় কল্পারম্ভ ও মহাঅষ্টমীর বিহিত পূজা। ভক্তরা নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য মন্দিরে সমবেত হন। ঢাকের বাদ্য, কাঁসা ও শঙ্খের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। অঞ্জলি দেওয়ার সময় ভক্তরা জগতের মঙ্গল কামনায় দেবীর চরণে ফুল নিবেদন করেন। মহাঅষ্টমীর অন্যতম আকর্ষণ হলো চামুণ্ডা রূপে দেবীর বিশেষ আরাধনা, যা অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক।
কুমারী পূজার ঐতিহ্য ও তাৎপর্য
মহাঅষ্টমীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পর্বটি হলো ‘কুমারী পূজা’। সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে আদি শক্তি বা মহাশক্তি সবকিছু পরিচালনা করছে, তার আংশিক প্রকাশ ঘটে একজন নিষ্পাপ শিশুর মাঝে। বিশেষ করে নারীজাতির ভেতর যে সৃজনশীল ও মাতৃরূপ লুকিয়ে আছে, তাকে সম্মান জানাতেই এই আচার পালন করা হয়।
শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, সাধারণত এক থেকে ষোলো বছর বয়সী, ঋতুমতী হয়নি এমন বালিকাদের কুমারী রূপে পূজা করা হয়। বয়সভেদে এই কুমারীদের বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন—এক বছরের কন্যা ‘সন্ধ্যা’, দুই বছরের কন্যা ‘সরস্বতী’, তিন বছরের ‘ত্রিধা’, চার বছরের ‘কল্যানিকা’, পাঁচ বছরের ‘রোাহিনী’, ছয় বছরের ‘কালিকা’, সাত বছরের ‘চণ্ডিকা’, আট বছরের ‘শাম্ভবী’, নয় বছরের ‘দুর্গা’, দশ বছরের ‘সুব্রতাদি’ এবং তদূর্ধ্ব বয়সের বালিকারা ষোড়শী ও অম্বিকা নামে পূজিত হন। কুমারী শিশুকে লাল বা নতুন বস্ত্র পরিয়ে, ফুলের মালা, মুকুট, কপালে সিঁদুরের টিপ ও পায়ে আলতা দিয়ে দেবীসদৃশ সাজে সাজানো হয়। এরপর ষোড়শোপাচারে অর্থাৎ চন্দন, ফুল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্যের মাধ্যমে তার পূজা সম্পন্ন করা হয়।
বাংলাদেশে রামকৃষ্ণ মিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপে বহু বছর ধরে মহা ধুমধাম করে এই কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার বেলুড় মঠে প্রথম এই প্রথার পুনঃপ্রবর্তন করেন। তখন থেকেই এটি আধুনিক দুর্গাপূজার একটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
সন্ধিপূজার ক্ষণ
মহাঅষ্টমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো ‘সন্ধিপূজা’। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট—মোট ৪৮ মিনিটের এই সন্ধিক্ষণ অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। পঞ্জিকার নির্দেশ অনুযায়ী এই সময়েই দেবী দুর্গাকে চামুণ্ডা রূপে পূজা দেওয়া হয়। কিংবদন্তি রয়েছে, এই ক্ষণেই দেবী দুর্গা চণ্ড ও মুণ্ড অসুরকে বধ করেছিলেন। সন্ধিপূজায় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি ফল ও ফুল দিয়ে দেবীর পুজো করা হয়, যা পরিবেশকে আরও বেশি ভক্তিপূর্ণ করে তোলে।
সামাজিক সম্প্রীতি ও নারী শক্তির জাগরণ
কুমারী পূজা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি সমাজে নারীর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার এক অনন্য ঘোষণা। যে সমাজে কুমারীকে স্বয়ং মহাশক্তির রূপ হিসেবে পুজো করা হয়, সে সমাজে নারীর অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মহাঅষ্টমীর এই উৎসব মানবপ্রেমের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।
মহাঅষ্টমী ও কুমারী পূজা আমাদের আত্মশুদ্ধি এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা জোগায়। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের আমেজে এই দিনটি সব মানুষের মনে শান্তি, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের বার্তা বয়ে আনে।
পড়ুন : আজ দুপুরে প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব: ইশরাক
সা/


