জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে লন্ডন থেকে ইলিয়াস কাঞ্চনের আহবান

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২২ অক্টোবর। এ উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে লন্ডন থেকে বার্তা দিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’র প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন।

তিনি বলেন, প্রিয় দেশবাসী, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আপনাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। সেইসাথে সকল গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস যথাযোগ্য মর্যাদা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে পালনের জন্য আমি দেশবাসী, নিরাপদ সড়ক চাই নিসচার নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী, সড়ক ব্যবহারকারী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন। প্রিয় দেশ থেকে দূরে থাকলেও আমার মন পড়ে আছে আপনাদের কাছে, নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের কাছে। আমার অসুস্থতার সময়ে যাঁরা খোঁজ নিয়েছেন, ভালোবাসা জানিয়েছেন এবং সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই। নিসচার নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলনে যুক্ত সকল সহযোদ্ধার প্রতিও আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।

তিনি বলেন, ২২ অক্টোবর শুধু একটি দিবস নয়। এই দিনটি আমাদের শোক, স্মৃতি, আন্দোলন এবং সড়কে মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সড়ক দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, যাঁরা আহত হয়ে আজও শারীরিক ও মানসিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন এবং যেসব পরিবার প্রিয়জন হারিয়ে অসহনীয় বেদনা বহন করছে, আমি তাঁদের সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানাই। তাঁদের স্মরণ করার অর্থ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রতিটি মানুষের জীবনকে মূল্য দেওয়া।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নিসচা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সড়ক নিরাপত্তার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছে। ১৯৯৩ সালে প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় হারানোর পর আমি উপলব্ধি করি সড়কে একটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, তা পুরো সমাজের ক্ষতি। সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে মানুষের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে নিরাপদ সড়ক চাই প্রতিষ্ঠা করি। ১৯৯৪ সাল থেকে ২২ অক্টোবরকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালনের মধ্য দিয়ে নিসচা নিরাপদ সড়কের দাবিকে জনপরিসরে তুলে ধরেছে। নিসচার দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে সরকার ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা করে।

তিনি বলেন, এই ইতিহাস কোনো ব্যক্তির একার নয়, এটি সড়কে স্বজন হারানো মানুষের, নিসচার নিবেদিত কর্মীদের এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে কণ্ঠ তোলা দেশবাসীর সম্মিলিত ইতিহাস। তাই নিসচাকে তার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা, এর অবদান আড়াল করা কিংবা ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিষ্ঠিত তাৎপর্যকে মুছে ফেলা বা বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টা আমি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ত্যাগ ও প্রামাণ্য ইতিহাসকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। যারা ইতিহাস ও অবদান নিয়ে কথা বলবেন, তাঁদের কাছে আমার আহ্বান তথ্য, নথি ও সত্যের ভিত্তিতে কথা বলুন। নিসচার ভূমিকা বা ২২ অক্টোবরের তাৎপর্যকে খাটো করে দেখানোর কোনো চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ইতিহাসকে বিকৃত হতে দেওয়া হবে না।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনাকে আমরা অনেক সময় নিয়তি বা দুর্ভাগ্য বলে পাশ কাটাই। কিন্তু অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে থাকে চিহ্নিত ঝুঁকি, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, চালকের ক্লান্তি বা অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অনিরাপদ সড়ক, পথচারীর নিরাপদ পারাপারের অভাব এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়া। এসব ঝুঁকি কমানো যায়, যদি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। সড়ক দুর্ঘটনা অনিবার্য নয়, নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তুললে বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, সড়ক নিরাপত্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে জরুরি ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। আবাসিক এলাকা, স্কুল, হাসপাতাল ও বাজারের কাছে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পথচারীর জন্য দখলমুক্ত ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, পর্যাপ্ত সড়কবাতি ও স্পষ্ট নির্দেশক নিশ্চিত করতে হবে। যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা বাস্তব ও কার্যকর হতে হবে, ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক-টায়ার, অতিরিক্ত যাত্রী বা মাল বোঝাই এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। চালকের লাইসেন্স দেওয়ার আগে দক্ষতা যাচাই ও প্রশিক্ষণ জরুরি, আর পেশাদার চালকের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের নিয়মও মানতে হবে।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, স্পষ্ট দায়িত্ব এবং সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথায় দুর্ঘটনা ঘটছে, কখন ঘটছে, কারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন এবং দুর্ঘটনার কারণ কী, এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু দুর্ঘটনার পর দায়ী ব্যক্তি খোঁজা নয়, দুর্ঘটনা ঘটার পেছনে থাকা সড়ক, যানবাহন, পরিবহন পরিচালনা ও তদারকির ত্রুটিগুলোও তদন্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমি দেশে না থাকলেও নিসচার কাজ থেমে থাকবে না। সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি আমার আহ্বান আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন, নিসচার ইতিহাস ও আদর্শকে ধারণ করুন, তথ্যভিত্তিকভাবে কথা বলুন এবং সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলন আরও জোরদার করুন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন কোনো বিভ্রান্তি বা অপপ্রচারে থেমে যাবে না। দেশবাসীর সহযোগিতা নিয়ে নিসচা তার কাজ চালিয়ে যাবে।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এ বছর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে সরকারের কাছে আমার আন্তরিক আবেদন শুধু দিবস পালনের মধ্যেই যেন আমাদের উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না থাকে। ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য এক বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। পরিকল্পনায় কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থা কোন কাজ করবে, কখন করবে এবং সেই কাজের অগ্রগতি কীভাবে যাচাই করা হবে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। পরবর্তী জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে গত এক বছরের কাজের প্রকাশ্য মূল্যায়ন করা হোক। কী লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে এবং কেন রয়ে গেছে এসব তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। যে ক্ষেত্রগুলোতে দুর্বলতা থাকবে, সেগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী বছরের কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ সময়ে নতুন কোনো ঝুঁকি বা প্রয়োজন দেখা দিলে সেটিও পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে।

ইলিয়াস কাঞ্চন আহবান জানান, এভাবে প্রতি বছর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও সংশোধনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক দিবস হয়ে থাকবে না; এটি সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠবে। সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা—এই ২২ অক্টোবর থেকেই এক বছরের কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক এবং পরবর্তী ২২ অক্টোবর দেশবাসীকে তার বাস্তব অগ্রগতি ও ঘাটতির হিসাব জানানো হোক। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়তি বলে মেনে নেব না। প্রতিটি ঝুঁকি চিহ্নিত করব, আইন প্রয়োগের দাবি তুলব, নিরাপদ অবকাঠামোর জন্য কাজ করব এবং সড়কে প্রতিটি মানুষের জীবনের মূল্য রক্ষা করব। সরকার, পরিবহনমালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী, পথচারী, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই নিরাপদ সড়ক গড়তে পারে।

সবশেষে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নিসচার কর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইল। আমার দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করবেন, যেন সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আপনাদের সঙ্গে আবারও সড়ক নিরাপত্তার কাজে সম্পৃক্ত হতে পারি।
সড়কে প্রতিটি জীবন মূল্যবান। নিরাপদ সড়ক গড়তে আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করি।
সবাইকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের শুভেচ্ছা।

পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : দেশে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৯৬৩ শিশু নিহত

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন