সাইবার নিরাপত্তায় জটিলতা তৈরি করছে এআই প্রযুক্তি

বিশ্বজুড়ে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি। বিভিন্ন খাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা খাতেও তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে এআইনির্ভর সাইবার হামলার বিস্তার, নিরাপত্তাব্যবস্থায় ভুয়া সতর্কবার্তার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ হুমকি শনাক্ত করতে জটিলতা বাড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে সাইবার হামলা প্রতিরোধের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা কমিয়ে প্রকৃত ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এন-এবল (N-able) প্রকাশিত ‘দ্য এআই ফগ রিপোর্ট: হোয়েন দ্য সিগন্যাল বিকামস দ্য নয়েজ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ফ্রন্টিয়ার এআইয়ের যুগে বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

ভুয়া সতর্কবার্তায় বাড়ছে চাপ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তা খাতে বর্তমানে সতর্কবার্তার আধিক্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং পেশাজীবীদের মধ্যে পরিচালিত জরিপে মোট ৫৯৫ জন অংশ নেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিরাপত্তা শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গত এক বছরে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় সতর্কবার্তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে সতর্কবার্তার সংখ্যা বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি।

নিরাপত্তাব্যবস্থায় বিপুলসংখ্যক সতর্কবার্তা তৈরি হলে প্রকৃত সাইবার হুমকি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের অপ্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তায় দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে নিরাপত্তা দলগুলোর জন্য শুধু বেশি তথ্য সংগ্রহ নয়, বরং সঠিক ও কার্যকর তথ্য চিহ্নিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

সতর্কবার্তা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ

গবেষণায় সতর্কবার্তার সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাব্যবস্থায় অ্যালার্ট বেড়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের উত্তরদাতাদের ৪০ দশমিক ২ শতাংশ শনাক্তকরণ টুলের সংখ্যা বৃদ্ধিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এ ছাড়া ২৬ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা এআইয়ের সহায়তায় দ্রুততর সাইবার হামলাকে সতর্কবার্তা বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে, ২০ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা একাধিক কারণের সম্মিলিত প্রভাবকে দায়ী করেছেন।

বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান সাইবার হামলা শনাক্ত ও প্রতিরোধের জন্য একাধিক নিরাপত্তা টুল ব্যবহার করছে। এসব টুল থেকে তৈরি হওয়া বিপুলসংখ্যক সতর্কবার্তা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই ধরনের হুমকি নিয়ে একাধিক সতর্কবার্তা তৈরি হলে কাজের পুনরাবৃত্তিও বাড়তে পারে। ফলে নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রযুক্তির সংখ্যা বাড়লেও কার্যকরভাবে হুমকি শনাক্ত করার সক্ষমতা সব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।

এআইয়ের সহায়তায় সাইবার হামলার অভিজ্ঞতা

প্রতিবেদনের আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য হলো, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, গত এক বছরে তাঁরা এআই প্রযুক্তির সহায়তায় পরিচালিত একাধিক সাইবার হামলার শিকার হয়েছেন।

এআই প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সাইবার অপরাধীরা আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে আক্রমণের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা এবং আক্রমণের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেবল প্রচলিত নিরাপত্তা সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল হুমকি শনাক্ত করা, সন্দেহজনক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। তাই তাদের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকির দিকে মনোযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এআই নিরাপত্তা সমাধানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন

এন-এবলের গবেষণায় বলা হয়েছে, বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তির ওপর একের পর এক নতুন এআইভিত্তিক স্তর যুক্ত করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অতিরিক্ত প্রযুক্তি ও টুলের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এ কারণে এআইভিত্তিক নিরাপত্তা সমাধানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কাজের অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো, সতর্কবার্তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আলাদা করা এবং নিরাপত্তাকর্মীদের যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা।

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সাইবার আক্রমণ শনাক্ত করা থেকে শুরু করে তা প্রতিরোধ করা পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনাই এআইয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হতে পারে। অর্থাৎ, শুধু আক্রমণের তথ্য জানানো নয়, বরং দ্রুত ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

তথ্যের পরিমাণ নয়, গুণগত মানই গুরুত্বপূর্ণ

সাইবার নিরাপত্তা খাতে এআইয়ের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মতামত নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ মনে করেন, সাইবার হুমকি ব্যাপকভাবে শনাক্ত করা এবং সঠিক তথ্য নির্ভুলভাবে তুলে ধরা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা হুমকির বিস্তৃত শনাক্তকরণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আর ২৯ দশমিক ৬ শতাংশের মতে, ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা কমিয়ে নিশ্চিত ও গুরুত্বপূর্ণ অ্যালার্ট পাওয়াই হওয়া উচিত এআইভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।

এই ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয়, সাইবার নিরাপত্তা পেশাজীবীরা এমন প্রযুক্তি চান, যা বিপুল পরিমাণ তথ্যের মধ্য থেকে প্রকৃত ঝুঁকি চিহ্নিত করতে পারবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দ্রুত সামনে এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।

সব মিলিয়ে, এআইয়ের দ্রুত বিকাশ সাইবার নিরাপত্তা খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর অপব্যবহার এবং অতিরিক্ত সতর্কবার্তার চাপ নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি তথ্যের মান উন্নত করা, অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে। এন-এবলের গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতের সাইবার নিরাপত্তায় সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কত বেশি হুমকি শনাক্ত করা হচ্ছে তার ওপর নয়, বরং প্রকৃত হুমকি কত দ্রুত ও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে, তার ওপরও।

পড়ুন:ব্র্যাক ব্যাংকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন