মাদক- একটি নীরব ঘাতক, যা তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয় সমাজ ও প্রজন্মকে। সর্বনাশা এই ব্যাধির হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতে দেশজুড়ে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতিতে কাজ করছে পুলিশ প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় নেত্রকোনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি-পূর্ব) বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ভারতীয় মদসহ এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা মাদকের বিষবাষ্প দূর করতে পুলিশের অভিযান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে, একই রাতে ভিন্ন দুটি অভিযানে উদ্ধার হওয়া একই ব্র্যান্ডের মদের মূল্যের বিস্তর ফারাক সাধারণ মানুষের মনে নতুন কৌতূহল ও ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত, অর্থাৎ ২৩ অক্টোবর রাত ১২টা ১০ মিনিটে নেত্রকোনা সদর থানাধীন ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নের বাইশধার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায় ডিবি (পূর্ব) পুলিশের চৌকস দল। এসআই (নিঃ) মো. আব্দুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের দলটি বাইশধার প্রাইমারি স্কুলের সামনের পাকা রাস্তায় অবস্থান নেয়। এ সময় বিশ্বজিৎ সরকার জয় (৩০) নামের এক যুবককে আটক করা হয়।
আটককৃত বিশ্বজিৎ কিশোরগঞ্জ জেলার পূর্ব তারাপাশা এলাকার কৃষ্ণপদ সরকারের ছেলে। তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় তিন বোতল ভারতীয় তৈরি ‘এসি ব্ল্যাক’ ব্র্যান্ডের মদ।
মাদক উদ্ধারের এ ঘটনায় বিশেষ একটি দিক সুধীজন ও সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে, যা নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। ডিবির জব্দ তালিকা অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত তিন বোতল ‘এসি ব্ল্যাক’ মদের আনুমানিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থাৎ, প্রতিটি বোতলের দাম দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকারও বেশি।
অথচ, ঠিক একই রাতে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানা পুলিশের পৃথক আরেকটি অভিযানে জব্দ করা হয় একই ব্র্যান্ডের বেশ কিছু মদ। সেখানে ৭৫০ মিলি মাপের আট বোতল ‘এসি ব্ল্যাক’ মদের প্রতিটির আনুমানিক মূল্য ধরা হয় তিন হাজার টাকা এবং ৩৭৫ মিলি মাপের আরও ২৪ বোতল মদের প্রতিটির মূল্য ধরা হয় দুই হাজার টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কলমাকান্দা থানা পুলিশের ধার্যকৃত মূল্যের সঙ্গে বাস্তবতার বেশ মিল রয়েছে। কিন্তু কলমাকান্দা থেকে মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার দূরের ঠাকুরাকোনায় ডিবি পুলিশ কর্তৃক উদ্ধারকৃত একই ব্র্যান্ডের মদের দাম দ্বিগুণেরও বেশি দেখানো নিয়েই তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। মাত্র কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে একই মদের দামে এত বড় তারতম্য কেন- এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম। তিনি জানান, ডিবি পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান চলমান প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।
ইতিমধ্যে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় ১৯৭৪ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা রুজু করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ধৃত আসামি বিশ্বজিৎ এর বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
মাদক চোরাচালান ও সেবন কেবল একজন ব্যক্তিকেই নয়, পুরো সমাজকাঠামোকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তাই মাদকের বিরুদ্ধে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। নেত্রকোনার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা পুলিশের তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তারা মনে করেন, নেত্রকোনা জেলা পুলিশের এমন ধারাবাহিক অভিযান মাদকমুক্ত সুস্থ সমাজ গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি, অভিযানের নথিপত্রে জব্দকৃত মাদকের সঠিক মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলোতে আরও বেশি স্বচ্ছতা বজায় থাকলে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় হবে বলে অভিমত সচেতন মহলের।
পড়ুন : নোয়াখালীতে চেয়ারম্যান প্রার্থী পদযাত্রায় নির্বাচনী উৎসব


