ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে মন্দা কাটছে, বাংলাদেশের মূল্যহ্রাস ও বাজার হিস্যা নিয়ে উদ্বেগ

চলতি ২০২৬ সালের শুরুর দিকের নেতিবাচক প্রবণতা কাটিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যদিও সার্বিক প্রান্তিকের বিচারে এখনও কিছুটা পিছিয়ে, তবে বছরের মাঝামাঝি থেকে ক্রয়াদেশ ও আমদানির গতি বাড়ায় বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিও ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর উপাত্তের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’ (বিএভি) সংকলিত প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

একক মূল্য হ্রাস ও বাজার হিস্যায় পতন:

বিএভির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১১৯৩ কোটি ইউরোতে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের ১৩৫০ কোটি ইউরোর তুলনায় ১৫৭ কোটি ইউরো বা ১১.৬৭ শতাংশ কম। রপ্তানির পরিমাণ ৪.৫৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজিতে।

প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমার প্রধান কারণ পণ্যের পরিমাণ হ্রাস পাওয়া নয়, বরং একক মূল্য কমে যাওয়া। প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ৭.৪৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৩.৭৬ ইউরোতে। এতে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের বাজার অংশ ২১.৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বছরের শুরুতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি ১৯ শতাংশ কমলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।

ইউরোপের সামগ্রিক বাজার ও মন্দার নেপথ্য কারণ:
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউর মোট পোশাক আমদানি ছিল ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩.৮৩ শতাংশ কম। মোট আমদানির পরিমাণ ২.৫৭ শতাংশ কমে ৩০৬ কোটি ৭৫ লাখ ৭০ হাজার কেজিতে নেমে আসে এবং গড় মূল্য ১.২৯ শতাংশ কমে হয় ১৯.৬৫ ইউরো।

এই আমদানিমন্দের পেছনে একাধিক বড় কারণ কাজ করেছে:

উচ্চ মজুত: ২০২৫ সালে ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (১.৫%) ও আমদানি (২.১% বেড়ে ৯ হাজার কোটি ইউরো) বেশি ছিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের কারণে চীন ইউরোপে রপ্তানি ১১.৬৪ শতাংশ বাড়ায় বছরের শুরুতে বিক্রেতাদের হাতে পণ্যের বাড়তি মজুত ছিল।

মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ইইউতে নতুন চাপ তৈরি করে, যা মূল্যস্ফীতি ৩.১ শতাংশে তোলার পূর্বাভাস দেয়।

ভোক্তার অনাস্থা: জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিতে ৪০ মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে যায় ভোক্তা আস্থা। ফলে জানুয়ারিতেই এক মাসে আমদানি আগের বছরের চেয়ে ১৫.৪৮ শতাংশ পড়ে যায়।

বছরের শুরুতে ক্রয়াদেশ কমানোর পর মে থেকে আগস্ট—এই চার মাসে ইইউর পোশাক আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বসন্তে খুচরা বিক্রি তুলনামূলক ভালো থাকার পাশাপাশি মে মাসে খুচরা বিক্রি ১.৯ শতাংশ বাড়ে। খুচরা বিক্রেতারা পুনরায় মজুত গড়তে শুরু করেন এবং শরৎ ও শীতকালীন চালানের ধাক্কায় বাজারে ইতিবাচক গতি ফেরে।

প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ভিন্ন চিত্র:

ইইউর বাজারে পোশাক সরবরাহকারী শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাজার হিস্যা ও রপ্তানি বাড়িয়ে চীন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে:

চীন: ইইউর বাজারে রপ্তানির মূল্য ও পরিমাণ বাড়ানো একমাত্র দেশ। তাদের রপ্তানি ২.৩৮ শতাংশ বেড়ে ১৯৭১ কোটি ইউরো হয়েছে এবং বাজারে অংশ ৩০.৭% থেকে বেড়ে ৩২.৭% হয়েছে।

ভিয়েতনাম: প্রতি কেজির গড় মূল্য ১০.১১% বাড়িয়ে মোট ৩০০০ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে (আয় বৃদ্ধি ৪.৪৬%)।

পাকিস্তান: রপ্তানির পরিমাণ ৩.৮২% বাড়ালেও প্রতি কেজির গড় মূল্য ১২.৯৬% কমিয়ে ১০.৮৮ ইউরোতে নামিয়েছে (যা সর্বনিম্নের তালিকায়)।

অন্যান্য: তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি মূল্য প্রায় ১১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

২০২৭ সালের পূর্বাভাস, ঝুঁকি ও নতুন বাণিজ্যনীতি:

ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর ইইউর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১.৪ শতাংশ হতে পারে (মূল্যস্ফীতি কমে ২.৪% হওয়ার সম্ভাবনা)। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ইতোমধ্যে চলতি বছরে ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট প্রবৃদ্ধি কমিয়েছে। তেলের ট্যাংকারে হামলা ও দীর্ঘায়িত সংঘাতের কারণে পরিবহন ও বিমা ব্যয় চড়া থাকলে এ পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে।

তাছাড়া, সম্প্রতি ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভে দেড় হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং পোশাকের দোকানগুলোর আয় ১৪% কমে যাওয়ায় নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও একই ধরনের অসন্তোষ দেখা গেছে। বড়দিনের বিক্রি দুর্বল হলে ২০২৭-এর শুরুতে ক্রয়াদেশ ফের কমতে পারে।

একই সাথে, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ইইউর নতুন জিএসপি বিধিমালা কার্যকর হওয়া এবং ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ফলে ভারতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। ফলে ভবিষ্যতে ইউরোপের বাজারে টিকতে হলে বাংলাদেশকে মান, গতি ও মূল্য প্রতিযোগিতায় বিশেষ নজর দিতে হবে।

পড়ুন : সৌদিগামী ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে ২২ হাজার যাত্রী

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন