ইন্টারনেট ছাড়াই এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেবে ওপেনএআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিবর্তে সংরক্ষিত ওয়েব কনটেন্ট ও কৃত্রিমভাবে তৈরি ইন্টারনেট পরিবেশ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওপেনএআই। শক্তিশালী এআই মডেলকে সরাসরি ইন্টারনেটে প্রবেশের সুযোগ দিলে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ কারণে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত রেখে মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট টেকক্রাঞ্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার ওপেনএআই তাদের নতুন এ নিরাপত্তানীতির কথা জানিয়েছে। এর আগে একই ধরনের পদক্ষেপ নেয় আরেক এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নতুন ও অধিক সক্ষম কয়েকটি এআই মডেলের সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। সাম্প্রতিক এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, উন্নত এআই মডেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণ পরিবেশের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

ওপেনএআইয়ের মতে, বর্তমান এআই নিরাপত্তা গবেষণা, পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট অবকাঠামোর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় শক্তিশালী এআই মডেলকে সরাসরি ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে প্রশিক্ষণ দেওয়াই দায়িত্বশীল পদ্ধতি। কারণ, অধিক সক্ষম এআই মডেল শুধু তথ্য বিশ্লেষণ বা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ডিজিটাল সিস্টেমের সঙ্গে সংযোগের সুযোগ পেলে সেগুলো জটিল কাজ সম্পাদন করতে পারে। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের সক্ষমতা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকলে কোনো মডেল অনিরাপদ ওয়েবসাইট, ক্ষতিকর নির্দেশনা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল উপকরণের সংস্পর্শে আসতে পারে। একই সঙ্গে নির্ধারিত নিরাপত্তাব্যবস্থা অতিক্রম করে বাইরের কোনো সিস্টেমে প্রভাব ফেলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে প্রশিক্ষণ চলাকালে মডেলের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ সেপ্টেম্বর ওপেনএআইয়ের একটি শক্তিশালী এআই মডেল সিস্টেমের কনফিগারেশনে থাকা ত্রুটির সুযোগ নিয়ে ইন্টারনেটে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। ঘটনাটি প্রশিক্ষণ পরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। এর পর নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চালানোর জন্য ওই মাসের বাকি সময়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থগিত রাখে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ধরনের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, উন্নত এআই মডেলকে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে সেই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কনফিগারেশনের সামান্য ত্রুটি কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা পুরো প্রশিক্ষণ পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে শক্তিশালী মডেলের ক্ষেত্রে এমন দুর্বলতার সম্ভাব্য প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।

তবে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ভিত্তিতে সব এআই মডেল বা প্রশিক্ষণব্যবস্থা সমান ঝুঁকিতে রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং ঘটনাটি প্রশিক্ষণ পরিবেশের নিরাপত্তা যাচাই, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে।

নতুন ব্যবস্থায় ওপেনএআই সরাসরি ইন্টারনেট সংযোগের পরিবর্তে বিপুল পরিমাণ সূচিবদ্ধ ও সংরক্ষিত ওয়েব কনটেন্ট ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। এসব কনটেন্টের মাধ্যমে এআই মডেল প্রয়োজনীয় তথ্যের সঙ্গে কাজ করতে পারবে। কিন্তু প্রশিক্ষণের সময় বাইরের কোনো ব্যবস্থা বা সিস্টেমে সরাসরি প্রভাব ফেলার সুযোগ থাকবে না।

এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো তথ্য ব্যবহারের সুবিধা বজায় রেখে ইন্টারনেটের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের ঝুঁকি কমানো। অর্থাৎ, মডেলকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও উপকরণ সরবরাহ করা হবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মাধ্যমে। এতে প্রশিক্ষণের জন্য প্রাসঙ্গিক কনটেন্ট ব্যবহার করা সম্ভব হলেও মডেলের বাইরের ডিজিটাল অবকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সীমিত থাকবে।

সংরক্ষিত কনটেন্ট ব্যবহারের আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, প্রশিক্ষণের উপকরণগুলো নির্দিষ্টভাবে সাজানো ও পর্যবেক্ষণ করা সহজ হতে পারে। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে কনটেন্টের মান, তথ্যের বৈচিত্র্য এবং প্রশিক্ষণ পরিবেশ কতটা নিরাপদভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।

শুধু ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে ওপেনএআই। এ কারণে এআই মডেলগুলো নির্ধারিত নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে কী ধরনের দুর্বলতা তৈরি হতে পারে, তা যাচাই করতে বিভিন্ন পরীক্ষাও চালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ধরনের পরীক্ষা এআই নিরাপত্তা গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে মডেল নির্ধারিত সীমার মধ্যে কাজ করছে কি না, কোনো দুর্বলতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে কি না এবং বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা মূল্যায়ন করা সম্ভব। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ পরিবেশের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এআই মডেলের আচরণ জটিল হওয়ায় সব ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা কঠিন। তাই প্রশিক্ষণ পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

এআই মডেলকে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি প্রযুক্তি খাতে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়নকে কঠিন ও ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করেছিলেন। কারণ, একটি আধুনিক এআই প্রশিক্ষণ পরিবেশ পরিচালনায় বিপুলসংখ্যক গবেষক, বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার, উপকরণ এবং ডিজিটাল সেবার প্রয়োজন হয়।

ওপেনএআইয়ের এক নিরাপত্তা প্রকৌশলীও এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ও সেবার প্রয়োজন হয়। হাজারো গবেষক এসব পরিবেশ তৈরি, পরিবর্তন ও পরীক্ষা করেন। ফলে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন পরিবেশে মডেলকে রাখলেই সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এ কারণে নিরাপত্তাব্যবস্থা বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সফটওয়্যার, তথ্যের উৎস এবং বিভিন্ন সেবার প্রবেশাধিকারও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ ও গবেষণার কাজ সচল রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়।

সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ না দিয়ে সংরক্ষিত কনটেন্টের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিলে এআই মডেলগুলো আগের মতো একই মানের সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে নিয়মিত পরিবর্তিত তথ্য, নতুন ওয়েবসাইটের কনটেন্ট এবং তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় এমন তথ্যের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত উপকরণের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রিত প্রশিক্ষণ পরিবেশ নিরাপত্তার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মডেলের সক্ষমতা, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ উন্নত এআই মডেলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রযুক্তি খাতের বাড়তি সতর্কতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যতে শক্তিশালী এআই মডেল তৈরির ক্ষেত্রে শুধু বেশি তথ্য ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারই নয়, বরং প্রশিক্ষণ পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে সংরক্ষিত কনটেন্টনির্ভর এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগ ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর।

পড়ুন:বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার শঙ্কায় বহু ওয়েবসাইট বন্ধ

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন