চলতি বছর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও ভারতের অবস্থান নিয়ে নতুন পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশ। এ বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। বিপরীতে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। অর্থাৎ এ হিসাবে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ১৩৭ ডলার বেশি হতে পারে।
গত রোববার প্রকাশিত আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে আইএমএফের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকার অর্থ এই নয় যে সামগ্রিক অর্থনীতির আকার, প্রবৃদ্ধি কিংবা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সব সূচকেই বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। অর্থনীতির মোট আকার ও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে ভারত এখনো বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান তুলনা করতে হলে মাথাপিছু আয়, মোট উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার মতো বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা সাত বছর মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। তবে ২০২৫ সালে ভারত আবার বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যায়। আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আবারও এই সূচকে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির আলোচনায় বাংলাদেশের এই অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর কয়েক দশকে বাংলাদেশ রপ্তানিমুখী শিল্প, প্রবাসী আয় এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। এসব খাতের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক সাফল্যের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। দেশটির অর্থনীতি বর্তমানে পাকিস্তানের অর্থনীতির চেয়েও বড়। তবে অর্থনীতির আকারে ভারত অনেক এগিয়ে থাকায় দুই দেশের সামগ্রিক সক্ষমতার তুলনায় মাথাপিছু জিডিপির হিসাব একমাত্র বিবেচ্য সূচক নয়।
মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও দুই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির আকারে বড় ব্যবধান রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হতে পারে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারতের মোট জিডিপি দাঁড়াতে পারে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি ডলারে। অর্থাৎ মোট অর্থনীতির আকারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড় হতে পারে।
অর্থনীতির এই পার্থক্যের পেছনে ভারতের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা খাত, শিল্প উৎপাদন এবং কৃষির ভূমিকা রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী হওয়ায় বিভিন্ন খাত থেকে উৎপাদন ও আয় আসে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি, জ্বালানির দাম কিংবা রপ্তানি বাজারে পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আইএমএফের পূর্বাভাসে চলতি বছর ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিতেও ভারত বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মূল্যস্ফীতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আলজাজিরার বিশ্লেষণে আইএমএফের পূর্বাভাসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। ভারতে এ হার হতে পারে ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বেশি হলে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যায় এবং একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয়। ফলে মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ বাড়লেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার সুফল পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
মাথাপিছু জিডিপির তুলনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি)। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্থানীয় বাজারে পণ্য-সেবার দাম বিবেচনা করে মানুষের অর্থ দিয়ে প্রকৃতপক্ষে কতটা কেনাকাটা করা সম্ভব, তা তুলনা করা হয়।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পিপিপি বিবেচনায় ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার। অর্থাৎ এই সূচকে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। তাই সাধারণ ডলারে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ ও ২০২৮ সালেও মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকতে পারে। তবে ২০২৯ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছাতে পারে। সে সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার। অর্থাৎ বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সালে আবারও এই সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে যেতে পারে ভারত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা ও শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়ানোও প্রয়োজন।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, মাথাপিছু জিডিপি কোনো দেশের প্রত্যেক নাগরিকের প্রকৃত আয় নির্দেশ করে না। এটি মোট দেশজ উৎপাদনকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া একটি গড় হিসাব। আয় ও সম্পদের বৈষম্য, কর্মসংস্থানের মান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় এতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না। তাই বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও মানুষের জীবনমানের প্রকৃত উন্নতি মূল্যায়নে আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পড়ুন:টানা তিনবার কোপা ট্রফি জিতলেন লামিন ইয়ামাল
ইমি/


