সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় খারজ প্রদেশ লক্ষ্য করে চারটি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সাহায্যে সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তুর্কি আল-মালিকি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার তথ্য জানান। এ ঘটনার পর সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল এবং খারজ এলাকায় সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছিল দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী। পরে সংস্থাটি জানায়, উভয় এলাকার জন্য তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে।
হুথিদের এই হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকাগুলো ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। হুথিরা বাব আল-মানদেব প্রণালীর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। এই প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথে সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বাব আল-মানদেব ও হরমুজ—দুটি প্রণালিই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে অঞ্চলটির সামরিক সংঘাত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার ফলে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতির স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ওই যুদ্ধবিরতির ফলে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণকারী হুথিদের মধ্যে সরাসরি হামলা অনেকাংশে কমে এসেছিল।
ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে যুক্ত। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে। অন্যদিকে, হুথিরা ইরানের সমর্থন পেয়ে থাকে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ওপর পড়ছে।
সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও জোটের দাবি অনুযায়ী, সব আকাশযান প্রতিহত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিক বিপদ কেটে গেছে, তবু এ ধরনের হামলা সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও হুথিদের মধ্যে সংঘাতের তীব্রতা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান বিরোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত। হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় ইয়েমেনের সংঘাত বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার নতুন একটি ফ্রন্টে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে সামরিক তৎপরতা বাড়লে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হতে পারে, যা পরিবহন ব্যয় ও পণ্য সরবরাহের সময় বাড়িয়ে দিতে পারে।
পড়ুন:ইসরায়েলে আজ ভোট, নেতানিয়াহুর পরাজয় নাকি উত্থান?
ইমি/


