ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের রাজধানী গুয়াহাটির একটি হোটেলে এলোপাতাড়ি গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের আর্থিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ঘনকান্ত গগৈকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি পিস্তলও উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে গুয়াহাটির জিএস রোডসংলগ্ন বোরা সার্ভিস এলাকার ‘বিলাস ইন’ হোটেলে এ ঘটনা ঘটে। গুলিতে হোটেলটির মালিকপক্ষের সদস্যসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া হোটেলের এক কর্মচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে হোটেলটির ভেতর থেকে একটানা গুলির শব্দ শুনতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে তাঁরা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে হোটেলের একটি কক্ষ থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। হোটেলের বাইরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আরও একজনকে পাওয়া যায়। তাঁকে দ্রুত গুয়াহাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন হোটেলটির মালিক হেলেনা ভরালি, তাঁর ছেলে এষাণ কাশ্যপ ওরফে দেবর্ষি কাশ্যপ, তাঁর দাদা ভূদেব ভরালি, নারায়ণ দাস এবং আরও একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। শেষোক্ত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
হোটেলকর্মী সত্যেন্দ্র পাঠকও হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁর হাতে গুলি লেগেছে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গুয়াহাটির পুলিশ কমিশনার পার্থসারথি মহন্ত জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে জঙ্গি হামলা কিংবা আকস্মিক সশস্ত্র ছিনতাই বলে মনে হচ্ছে না। বরং দীর্ঘদিনের আর্থিক লেনদেন ও সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ‘বিলাস ইন’ হোটেলটির মূল মালিক ছিলেন বরপেটার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রয়াত ধ্রুব ভরালি। তাঁর মৃত্যুর পর হোটেলটির মালিকানা পান তাঁর স্ত্রী হেলেনা ভরালি ও পরিবারের সদস্যরা।
প্রায় এক বছর আগে হোটেলটি পরিচালনার জন্য ঘনকান্ত গগৈকে লিজ দেওয়া হয়। এরপর থেকে হোটেলের লিজ চুক্তি, বকেয়া অর্থ পরিশোধ এবং পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঘনকান্তের সঙ্গে হেলেনা ও তাঁর পরিবারের বিরোধ চলছিল।
সোমবার রাতে এ-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা বৈঠক বা আলোচনার সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ঘনকান্ত গগৈ নিজের কাছে থাকা পিস্তল বের করে হোটেলের মালিকপক্ষের সদস্য ও কর্মচারীদের লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালান বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
তবে বৈঠকে ঠিক কী নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল এবং কীভাবে তা প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নেয়, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান ঘনকান্ত গগৈ। পরে তিনি গুয়াহাটির পল্টনবাজার এলাকায় আত্মগোপনের চেষ্টা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে দ্রুত অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের একাধিক দল।
পুলিশ কমিশনার পার্থসারথি মহন্ত জানান, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত লাইসেন্সপ্রাপ্ত পয়েন্ট ৩২ বোরের একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্তকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গুয়াহাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ ও ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ফরেনসিক ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
পুলিশের ধারণা, হোটেলের মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধই এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে। লিজের শর্ত, বকেয়া অর্থ এবং হোটেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ ঘটনায় একসঙ্গে পাঁচজনের মৃত্যু হওয়ায় গুয়াহাটিতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ কীভাবে এত বড় প্রাণঘাতী ঘটনায় রূপ নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের পেছনের পূর্ণাঙ্গ কারণ এবং অভিযুক্তের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। পুলিশ বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, উদ্ধার করা আলামত এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।
পড়ুন:পাঁচ দশক ধরে জাপান বাংলাদেশের সেরা উন্নয়ন সহযোগী
ইমি/


