“উন্নয়নে চাই সমতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণ”- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নেত্রকোনায় নাগরিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বেলা ১২টার দিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নেত্রকোনা জেলা শাখা কার্যালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরাম, নেত্রকোনার আয়োজনে এবং স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের সহযোগিতায় এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে স্বাস্থ্য খাতের নানা দিক, প্রাপ্তি ও জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন।
সভার শুরুতে সভাপতির বক্তব্যে নেত্রকোনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন, “স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি হিসেবে আমি খুব স্বল্প সময় ধরে কাজ করছি। একটি সংগঠনকে সঠিকভাবে গুছিয়ে নিতে হলে বিভিন্ন দিক চিন্তা করতে হয় এবং কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। আমরা জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “২০২৫ সালে আমরা কী কাজ করেছি এবং তার ফলাফল কী-সে বিষয়ে পর্যালোচনা করে ২০২৭ সালের জন্য নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে সকলের সহযোগিতা নিয়ে এই ফোরামটিকে সুদৃঢ় ও সুন্দর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
মতবিনিময় সভায় পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন নেত্রকোনা সদরের এএফডব্লিউ (এমসিএইচ-এফপি) কোহিনুর আক্তার। তিনি বলেন, “উন্নয়নে সমতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে হবে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, গত দেড় থেকে দুই বছর যাবত পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মেথড বা পদ্ধতি সরকারিভাবে সরবরাহ না থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।”
তিনি আরও জানান, সচেতনতার অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা এখনো ৫০ শতাংশের ওপরে উন্নীত করা সম্ভব হচ্ছে না। বাড়িতে প্রসবের ফলে মায়েদের প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ (PPH), দীর্ঘস্থায়ী প্রসব বেদনা (prolonged labor) এবং মৃত শিশু প্রসবের (stillbirth) মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে কিশোরী গর্ভবর্তীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়লেও বাল্যবিয়ে রোধে সামাজিক ও প্রশাসনিক কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দেন।
ব্র্যাকের এরিয়া ম্যানেজার (বিএইচপি) লিপি তার বক্তব্যে বলেন, “আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা ইউনিয়ন পর্যায়ে গর্ভবতী মায়েদের সেবা প্রদান, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো এনসিডি (NCD) রোগীদের শনাক্ত করে সদর হাসপাতালের এনসিডি কর্নারে রেফার করছেন। পাশাপাশি ইপিআই কার্যক্রমেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক প্রচারণায় আমরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি।”
নেত্রকোনা উদীচীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ থাকলেও তার সঠিক বণ্টন ও সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। সাধারণ মানুষ যাতে সহজে ও চিকিৎসকদের যথাযথ সেবা পায়, সে বিষয়ে মনিটরিং আরও জোরদার করতে হবে।”
নেত্রকোনা মহিলা পরিষদের সদস্য রেহানা সিদ্দিকী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে সাধারণ মানুষের জন্য আরও সুব্যবস্থা এবং দালাল চক্র ও অনিয়ম রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আকলিমা আক্তার হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমি সদর হাসপাতালে যোগদানের পর থেকেই গাইনি ইনডোরসহ বিভিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছি। ইমার্জেন্সিতে সাধারণ সর্দি-কাশি বা সামান্য জ্বর নিয়ে প্রচুর রোগী আসায় এবং হাসপাতালের শৃঙ্খলা রক্ষায় হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় প্রকৃত জরুরি রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। তদুপরি, হাসপাতালে জনবল সংকট, রোগীর তুলনায় বেডের স্বল্পতা এবং শৌচাগার ও পরিচ্ছন্নতার অভাব আমাদের কাজের বড় বাধা।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গর্ভকালীন চেকআপ, আয়রন ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটের প্রাপ্যতা এবং নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে গর্ভকালীন জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব, যদি সাধারণ মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যসচেতনতা আরও বৃদ্ধি পায়।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেকমো মনিরা হোসেন, সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রতিনিধি এবং জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের বিভিন্ন সদস্যবৃন্দ। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সফলভাবে সঞ্চালনা করেন স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির ব্যবস্থাপক কোহিনূর বেগম।
সভা শেষে বক্তারা বলেন, নেত্রকোনাবাসীর দোরগোড়ায় মানসম্মত নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের যৌথ ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
পড়ুন : খুলনায় একদিনে তিনজনকে গুলি, আহত দুই যুবদল নেতা


