সীমান্তের চোরাই পথগুলোতে যখন রাতের অন্ধকার কিংবা ভোরের কুয়াশা নেমে আসে, তখন চোরাচালানিদের তৎপরতা বাড়ে। দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জাগ্রত চোখের ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। নেত্রকোনার দুর্গম পাহাড়ি ও নদীবেষ্টিত সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবির টানা পনেরো ঘণ্টার সাঁড়াশি অভিযানে আবারও ভেস্তে গেছে চোরাকারবারিদের পরিকল্পনা। গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে আজ বুধবার ভোর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট থেকে মালিকবিহীন অবস্থায় ভারতীয় কম্বল, কসমেটিক্স, গরু, কয়লা এবং পাচারের অপেক্ষায় থাকা দেশীয় শিং মাছসহ পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৮০৪ টাকা মূল্যের মালামাল জব্দ করেছে নেত্রকোনা ব্যাটালিয়ন (৩১ বিজিবি)।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ৩১ বিজিবি’র অধিনায়ক ও পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদুল বারী (পিএসসি)।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্তের ছয়টি পৃথক বর্ডার অবজারভেশন পোস্টের (বিওপি) টহল দল এসব চোরাচালান বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। প্রতিটি অভিযানেই বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা মালামাল ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক অভিযানটি পরিচালিত হয় বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোর আনুমানিক ৫টা ৫০ মিনিটে। দেশের সম্পদ অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার আগেই তা রুখে দেয় ৩১ বিজিবির ভরতপুর বিওপি’র সদস্যরা। সীমান্ত পিলার ১১৬৬/৩-এস থেকে আনুমানিক দেড়শো গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গাজিরকোনা নামক স্থানে অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১৩০ কেজি বাংলাদেশি শিং মাছ জব্দ করা হয়। আটককৃত মাছের সিজার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২ হাজার টাকা। পচনশীল পণ্য হওয়ায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে নেত্রকোনা কাস্টমস প্রতিনিধির সমন্বয়ে মাছগুলো নিলামে বিক্রি করা হয়েছে।
সামনেই শীত মৌসুমের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় কম্বল ও প্রসাধনী সামগ্রী অবৈধভাবে দেশে ঢোকানোর চেষ্টা করছে অসাধু চক্র। গতকাল (মঙ্গলবার) দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চারটি পৃথক অভিযানে বিপুল পরিমাণ প্রসাধনী ও কম্বল জব্দ করে বিজিবি।
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লেংগুড়া বিওপি’র টহল দল সীমান্ত পিলার ১১৭২ এমপি হতে তিনশো গজ ভেতরে ঐতিহাসিক সাত শহীদের মাজার এলাকা থেকে ৫৩০ পিস ভারতীয় ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ক্রিম জব্দ করে, যার বাজারমূল্য দুই লাখ ২৫ হাজার ২৫০ টাকা। একই দিন রাত ৯টার দিকে খারনই বিওপির সদস্যরা সীমান্ত পিলার ১১৭৮ এমপি হতে তিনশো গজ ভেতরে বালমাঠ এলাকা থেকে আরও ১৪৩ পিস ভারতীয় কসমেটিক্স জব্দ করে, যার মূল্য ১৫ হাজার ৪৩৪ টাকা।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় নলুয়াপাড়া বিওপি’র টহল দল সীমান্ত পিলার ১১৫৯ এমপি হতে চারশো গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাদামবাড়ী এলাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ১০ পিস ভারতীয় কম্বল আটক করে। এর ঠিক আড়াই ঘণ্টা পর, রাত সাড়ে ৯টায় বিজয়পুর বিওপির সদস্যরা সীমান্ত পিলার ১১৫০ এমপি হতে তিনশো গজ ভেতরে পশ্চিম বিজয়পুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ২০ পিস ভারতীয় কম্বল জব্দ করে, যার আনুমানিক মূল্য এক লাখ টাকা।
একই দিনে মোহনপুর বিওপির টহল দল দুটি সফল অভিযান পরিচালনা করে। মঙ্গলবার দুপুর ২টায় সীমান্ত পিলার ১১৮৯/৬-এস হতে দুইশো গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কড়াইবাড়ী এলাকা থেকে ৭০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে একই বিওপির সদস্যরা সীমান্ত পিলার ১১৮৮/৩-এস হতে তিনশো গজ ভেতরে মহেষখোলা নদীর পাড় থেকে মালিকবিহীন অবস্থায় ৭৫৬ কেজি ভারতীয় কয়লা জব্দ করে, যার সিজার মূল্য ১৫ হাজার ১২০ টাকা।
৩১ বিজিবির অধিনায়ক তৌহিদুল বারী জানান, জব্দকৃত মালামালের মধ্যে শিং মাছ ও ৭৫৬ কেজি ভারতীয় কয়লা ইতোমধ্যে নেত্রকোনা কাস্টমস প্রতিনিধির উপস্থিতিতে নিলাম করা হয়েছে এবং জব্দকৃত ভারতীয় গরুটিও কাস্টমস প্রতিনিধির সমন্বয়ে নিলাম করার প্রক্রিয়া চলছে।
এছাড়াও আটককৃত ৩০ পিস ভারতীয় কম্বল এবং ৬৭৩ পিস ভারতীয় কসমেটিক্স নেত্রকোনা কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধে বিজিবির এ ধরনের কঠোর অবস্থান ও গোয়েন্দা নজরদারি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান বিজিবি’র ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা।
পড়ুন : রংপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বাসের ধাক্কায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪
সা/


