রাজশাহীর বস্তিতে ১লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ মানবেতর জীবন, বস্তিবাসির উন্নয়নে নেই কোন প্রদক্ষেপ

রাজশাহী মহানগরীর ১০৪টি বস্তিতে প্রায় ৩২ হাজার ৫শত পরিবার রয়েছে। যার লোকসংখ্যা ১ লক্ষ ৩০ হাজার। তাদের বাস্তব জীবন অত্যন্ত মানবেতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ। বস্তিবাসির উন্নয়নে নেই কোন সরকারী উদ্দ্যোগ। বস্তিবাসি ভালো থাকলে শহরবাসি ভালো থাকবে। দেশের যে কোন শহর পরিস্কারে তাদের ভূমিকা অন্যতম।

বিজ্ঞাপন

দেশে রাজশাহী পরিবেশবান্ধব ও সবুজ নগরী হিসেবে প্রশংসিত হলেও বস্তিবাসী এবং প্রান্তিক নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর নিরাপদ আবাসন ও মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। ‘বিশ্ব সিটি দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে ‘শহরের পুনরুজ্জীবন: সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’ (জবমবহবৎধঃরহম ঃযব ঈরঃু: অফবয়ঁধঃব ঐড়ঁংরহম ভড়ৎ অষষ) প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এক বিশেষ নাগরিক সংলাপে উপস্থিত বক্তারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

রাজশাহী মহানগরীর এসকেএস সেমিনার হলে বিশ্ব সিটি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে টেকসই নগর উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক অধিকার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন এর সভাপতিত্বে ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমানের সঞ্চলনায় সংলাপে মূল প্রবন্ধ ও গবেষণা প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন বারসিকের নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজশাহী মহানগরীর ১০৪টি চিহ্নিত বস্তিতে প্রায় ৩২ হাজার ৫শত পরিবারের ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ অত্যন্ত মানবেতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন।

ঢাকা বা চট্টগ্রামে বস্তির উন্নয়ন বা সামাজিক আবাসন নিয়ে কিছু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বা মডেল দৃশ্যমান থাকলেও, রাজশাহীতে গ্রীন সিটি গড়ার প্রচারের আড়ালে বস্তিবাসীদের আবাসন নিয়ে কোনো কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান বা সরকারি বরাদ্দ এখন পর্যন্ত কার্যকর হতে দেখা যায়নি। বরেন্দ্র অঞ্চলের তীব্র তাপদাহে টিন ও প্ল্যাস্টিকের ঝুপড়ি ঘরগুলোতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং আইনি ভূমিস্বত্ব না থাকায় এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

সংলাপে সুজন-এর রাজশাহী জেলা সভাপতি শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “চওড়া সড়ক আর আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে নগরের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় না, যদি শহরের এক-দশমাংশ মানুষ চরম মানবিক সংকটে বাস করে। আবাসন নীতিমালায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

রুলফাউ উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, “জলবায়ু আঘাত ও খরা-নদীভাঙ্গনে বাস্তুচ্যুত হয়ে মানুষ রাজশাহী শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন। কিন্তু তাদের জন্য আইনি ভূমিস্বত্ব বা সামাজিক আবাসনের কোনো সরকারি মডেল গড়ে তোলা হয়নি।”

নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, “রাজশাহীর বস্তিবাসীরা প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ আতঙ্কে রাত কাটায়। ঢাকা বা চট্টগ্রামে বস্তির উন্নয়ন ও পুনর্বাসনে কিছুটা আইনি ও অবকাঠামোগত কাঠামোর চর্চা থাকলেও রাজশাহীতে বস্তিবাসীদের নাগরিক স্বীকৃতিই মিলছে না।”

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সাকিবুর রহমান বস্তিবাসী ও নাগরিক সমাজের দাবির সাথে একমত পোষণ করে জানান, টেকসই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বস্তি এলাকার পরিবেশগত মানোন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক আবাসনের বিষয়গুলোকে আগামী পরিকল্পনায় যুক্ত করার কাজ চলছে।

রাজশাহী গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার মাহিদুর রহমান সরকারি খাস জমি ও বাজেট ব্যবস্থাপনার আওতায় সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ পর্যালোচনার আশ্বাস দেন।

গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, “ রাজশাহী নগরে তীব্র তাপদাহে টিন ও প্লাস্টিকের ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করা মানববেতর বস্তিবাসীরা। প্রকৃত গ্রীন সিটি হতে হলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।”

সংলাপে নিজেদের কষ্ট ও করুণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন নামোভদ্রা বস্তির বাসিন্দা ওবিয়া বেগম এবং বুধপাড়া বস্তির জাহেদা খাতুন। তারা বলেন, “গরমের দিনে ঘরের ভেতর থাকা যায় না, স্যানিটেশন ও পানির তীব্র সংকট। উচ্ছেদের ভয় না রেখে আমাদের স্থায়ী বা অস্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়া হোক।”

এছাড়াও অনুষ্ঠানে বহরমপুর সার্বিক উন্নয়ন সংগঠনের সহ-সভাপতি মো. মতিমিয়া, তরুণ সংগঠক ফাতেমা-তুজ জোহরা, মো. রকি আলী, সম্রাট রায়হানসহ স্থানীয় বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক ও পেশাজীবী মানুষ অংশ নেন।

সংলাপ থেকে অন্তর্র্বতীকালীন সমাধান হিসেবে খাস জমিতে উচ্ছেদ না করে ‘অন-সাইট আপগ্রেডিং’, সিটি কর্পোরেশন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও সাধারণ নাগরিকদের সমন্বয়ে ‘আবাসন টাস্কফোর্স’ গঠন এবং বাজেটে বস্তি পুনর্বাসনে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের জোর দাবি জানানো হয়।

পড়ুন:টাঙ্গাইলে ট্রেন লাইনচ্যুত, ঢাকার সাথে উত্তরবঙ্গের ট্রেন চলাচল বন্ধ

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন