নিরাপদ সড়কের অঙ্গীকারে নেত্রকোনায় সম্মানিত হলেন ৪ দক্ষ চালক

সকালের চিরচেনা ব্যস্ত সড়কে বুধবার (২৮ অক্টোবর) কোনো যান্ত্রিক তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল না বেপরোয়া গতির প্রতিযোগিতা। তার বদলে শহরের রাজপথে ভেসে বেড়িয়েছে জীবনের জয়গান আর সচেতনতার বার্তা। ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’- সময়োপযোগী এই প্রতিপাদ্যকে বুকে ধারণ করে নেত্রকোনায় উদযাপিত হলো জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬। প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে দিনটি হয়ে উঠেছিল সড়কে প্রাণ বাঁচানোর সম্মিলিত অঙ্গীকারের এক মঞ্চ।

বিজ্ঞাপন

জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), নেত্রকোনা সার্কেলের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী কর্মসূচির সূচনা হয় বর্ণাঢ্য রোড শোর মধ্য দিয়ে। শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করা শোভাযাত্রাটি কেবল র‍্যালি ছিল না; বরং পথচারী, যাত্রী ও চালকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া জীবন্ত এক বার্তা ছিল। ব্যানার, ফেস্টুন আর সচেতনতামূলক স্লোগানে মুখরিত রোড শোটি শহরের সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর রেখাপাত করে। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি বলে দিচ্ছিল- সড়কের নিরাপত্তা আজ আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং প্রতিটি পরিবারের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

রোড শো শেষে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত হয় প্রাসঙ্গিক আলোচনা সভা। সেখানে বক্তাদের কণ্ঠে উঠে আসে সড়ক দুর্ঘটনার রূঢ় বাস্তবতা এবং তা থেকে উত্তরণের মানবিক ও বাস্তবসম্মত পথ।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ও মর্মস্পর্শী ভাষায় সড়কের বিশৃঙ্খলা রোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভার আলোচনায় একটি বিষয় বারবার প্রতিধ্বনিত হয়- সড়ক দুর্ঘটনা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি একেকটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের নাম। বক্তারা একবাক্যে স্বীকার করেন, শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ কিংবা জরিমানার ভয় দেখিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। যতক্ষণ না চালকের আসনে বসা মানুষটি, গাড়ির ভেতরের যাত্রী এবং সড়কের পাশ দিয়ে হাঁটা পথচারী নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হচ্ছেন, ততক্ষণ নিরাপদ সড়ক কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বক্তারা বলেন, যানবাহন চালানোর সময় নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, ওভারটেকিংয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বর্জন করা এবং ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সময়ের দাবি। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও চালককে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাতে প্ররোচিত না করা এবং পথচারীদের রাস্তা পারাপারে নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলা শুধু প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়; পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে। আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমেই নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

এবারের আয়োজনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও অনুপ্রেরণাদায়ী দিক ছিল মাঠপর্যায়ের নীরব নায়কদের স্বীকৃতি প্রদান। সচরাচর সড়ক দুর্ঘটনার পর চালকদের দিকেই প্রথম অভিযোগের আঙুল ওঠে। কিন্তু এই পেশাতেই যে রয়েছেন শত শত দায়িত্বশীল মানুষ, যারা বছরের পর বছর ধরে ট্রাফিক আইন মেনে, পরম সতর্কতায় যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন- তাদের সেই নিষ্ঠাকে সম্মান জানাতে ভোলেনি বিআরটিএ নেত্রকোনা সার্কেল।

আলোচনা সভা শেষে চারজন অভিজ্ঞ ও আদর্শ মোটরযান চালকের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিশেষ সম্মাননা ও সনদপত্র। ট্রাফিক আইন মেনে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে যান চালনার স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। মিলনায়তন ভর্তি দর্শকের করতালির মধ্যে যখন এই চার চালক সনদ গ্রহণ করছিলেন, তখন তাদের চোখেমুখে ছিল গর্বের ঝিলিক।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চালকদের পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পরিবহন খাতে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। দণ্ডের পাশাপাশি ভালো কাজের পুরস্কার অন্য চালকদেরও নিয়ম মেনে গাড়ি চালাতে এবং নিজেদের পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করতে উৎসাহিত করবে।

দিনশেষে নেত্রকোনাবাসীর মনে এই আয়োজন নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সচেতনতামূলক এমন কর্মসূচি কেবল এক দিনের আনুষ্ঠানিকতায় ফুরিয়ে যাবে না, বরং এর রেশ ছড়িয়ে পড়বে জেলার প্রতিটি সড়কে, প্রতিটি মোড়ে- এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজক ও সাধারণ মানুষের।

পড়ুন:মানবতাবিরোধী অপরাধ: মাহবুব-উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন