রাজশাহীতে ৪৪৫ বছরের ঐতিহাসিক ইসকন খেতুরী মহোৎসবে ভক্তদের উচ্ছ্বাস

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ৪৪৫ বছরের ঐতিহাসিক ইসকন খেতুরী ধামে শুরু হয়েছে শ্রীশ্রী নরোত্তম দাস ঠাকুরের তিরোভাব তিথি মহোৎসব। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন দেশ-বিদেশের ভক্ত ও পুণ্যার্থীরা। মহোৎসব ঘিরে মন্দির প্রাঙ্গণে চলছে ভজন-কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও নানা আধ্যাত্মিক আয়োজন। দেশে ও বিদেশের ভক্তরা বেশ উচ্ছ্বসিত।

ইতিহাস ও বৈষ্ণব অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে (আনুমানিক ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দের দিকে, মতান্তরে দোলপূর্ণিমা বা ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে) খেতুরীধামে প্রথম ঐতিহাসিক মহাসমারোহ বা মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রথম মহোৎসবে বৃন্দাবন ও বাংলা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রখ্যাত বৈষ্ণব ভক্ত ও আচার্যরা অংশ নিয়েছিলেন এবং এখানে বিভিন্ন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৬১১ খ্রিস্টাব্দের কার্তিকী কৃষ্ণা পঞ্চমী তিথিতে শ্রী নরোত্তম দাস ঠাকুর নীতলীলায় প্রবেশ করেন (পরলোক গমন করেন)। বর্তমান বার্ষিক উৎসব তাঁর সেই তিরোভাব তিথিকে স্মরণ করে প্রতিবছর সাধারণত আশ্বিন বা কার্তিক মাসে (দুর্গাপূজার পর) তিন দিনব্যাপী এই মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবের মূল আনূষ্ঠানিকতা শুরু হয় শুভ অধিবাসের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে দধিমঙ্গল, তারকব্রহ্ম নাম সংকীর্তন ও মহান্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে এটি সম্পন্ন হয়।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর শিয়ালায় শ্রীশ্রী রাধা-ব্রজমোহন মন্দির, ইসকন খেতুরী ধামে চলা শ্রীশ্রী নরোত্তম দাস ঠাকুরের এই তিরোভাব তিথি মহোৎসব বৃহস্পতিবার রাতে অধিবাস কীর্তনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। গত ২৯, ৩০ অক্টোবর এবং ১লা নভেম্বর তিন দিনব্যাপী এ ধর্মীয় আয়োজন শেষ হলো। শুক্রবার সকালে নগরসংকীর্তন ও মহাঅভিষেক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার দিনব্যাপী ভজন-কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও নানা আধ্যাত্মিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শেষ হবে তিন দিনের এ মহোৎসব। দিনভর ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে মহাপ্রসাদ।

মহোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ বিশেষ আরতি ও দামোদর অনুষ্ঠান। পাশাপাশি ভজন-কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠছে মন্দির প্রাঙ্গণ। এতে অংশ নিচ্ছেন ইসকনের নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভক্তরা।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ মহোৎসবে দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটবে। শ্রী শ্রী নরোত্তম দাস ঠাকুরের জীবন, শিক্ষা ও ভক্তিমূরলক আদর্শ স্মরণের পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছড়িয়ে দেওয়া জন্য এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর ভক্তির আবহে খেতুরী ধামের এ মহোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ারও এক মিলনমেলা।
খেতুরীধাম (বা খেতুরধাম) গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র একটি তীর্থক্ষেত্র। এটি বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় পদ্মা নদীর তীরবর্তী খেতুর গ্রামে অবস্থিত। প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই ধামটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের (বিশেষ করে বৈষ্ণব ভক্তদের) কাছে অত্যন্ত মহিমান্বিত ও ঐতিহাসিক এক স্থান।

উৎপত্তি ও পটভূমি খেতুরীধামের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত ষোড়শ শতাব্দীর প্রখ্যাত গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাধক ও আচার্য শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর-এর সঙ্গে। ১৫৩১ খ্রিষ্টাব্দের মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে বর্তমান রাজশাহীর গোদাগাড়ীর গোপালপুর বা পদ্মাতীরবর্তী অঞ্চলে রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নরোত্তম দাস। তাঁর পিতা রাজা কৃষ্ণনন্দ দাস ছিলেন সে অঞ্চলের এক বিশাল ভূসম্পত্তি বা জমিদারির অধিকারী এবং মাতা ছিলেন নারায়ণী দেবী।

রাজপরিবারে জন্ম নিলেও পার্থিব ধন-সম্পদ বা বিলাসবহুল জীবনের প্রতি নরোত্তম দাসের কোনো মোহ ছিল না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি আধ্যাত্মিক টানে এবং বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগ করে ভারতের বৃন্দাবনে চলে যান।

বৃন্দাবনে গিয়ে তিনি বৈষ্ণবকূলশিরোমণি শ্রীল লোকনাথ গোস্বামীর শরণাপন্ন হন। লোকনাথ গোস্বামী প্রথমে তাকে দীক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানালেও নরোত্তমের কঠোর সাধনা, সেবা ও ভক্তি দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে মন্ত্রে দীক্ষা দেন। লোকনাথ গোস্বামী তাঁর জীবনে একমাত্র নরোত্তম দাসকেই শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

খেতুরীধাম প্রতিষ্ঠা ও শ্রীপাট গঠনবৃন্দাবন থেকে শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করে নরোত্তম দাস ঠাকুর তাঁর নিজ জন্মভূমি খেতুরে ফিরে আসেন। তিনি এখানে এসে গৌড়ীয় বৈষ্ণব প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে খেতুরীকে গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে ‘শ্রীপাট খেতুরীধাম’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি এখানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশিত ভক্তিপ্রেম ও নামসংকীর্তনের আদর্শ প্রচার করেন।

ঐতিহাসিক খেতুরী মহোৎসবের সূচনা খেতুরীধামের ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো ঐতিহাসিক ‘খেতুরী মহোৎসব’। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর তিরোধানের বহু বছর পর ভক্তদের অনুরোধে ও নির্দেশনায় নরোত্তম দাস ঠাকুর খেতুরে প্রথম মহাসমারোহে গৌরপূর্ণিমা মহোৎসব বা খেতুরী উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। সেই উৎসবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দ প্রভুর বিভিন্ন পার্ষদ ও ভক্তরা যোগ দিয়েছিলেন। এই উৎসবেই প্রথম বিভিন্ন বিগ্রহ বা শ্রীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং বিশাল পরিসরে নামসংকীর্তন ও মহাপ্রসাদ বিতরণের ধারা শুরু হয়, যা গত চারশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে।

নরোত্তম দাস ঠাকুরের তিরোধান ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দের কার্তিকী কৃষ্ণা পঞ্চমী তিথিতে এই ধামেই নরোত্তম দাস ঠাকুর নীতলীলায় প্রবেশ করেন (পরলোক গমন করেন)। তাঁর তিরোধানের পর থেকেই প্রতি বছর এই তিথিতে (সাধারণত আশ্বিন বা কার্তিক মাসে) তাঁর স্মরণে তিন দিনব্যাপী তিরোভাব তিথি মহোৎসব পালিত হয়ে আসছে।

প্রতিবছর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষাধিক পুণ্যার্থী ও বৈষ্ণব ভক্তের সমাগম ঘটে। এটিকে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ মহামিলন উৎসব হিসেবে গণ্য করা হয়।

খেতুরীধামে মূল মন্দিরসহ বেশ কিছু প্রাচীন স্মৃতি বিজড়িত স্থান ও ঘাট (যেমন প্রেমতলী ঘাট) রয়েছে, যেগুলোকে ভক্তরা অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করেন। সংক্ষেপে, খেতুরীধাম কেবল একটি তীর্থস্থানই নয়, এটি বাংলা সংস্কৃতি, বৈষ্ণব সাহিত্য, সংগীত (বিশেষ করে নরোত্তমী সঙ্গীতের ধারা) এবং বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অমূল্য ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

খেতুরীধামের এই ঐতিহাসিক মহোৎসবের মূল সূতিকাগার হলো বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার খেতুর গ্রাম। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রধান প্রচারক শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর বৃন্দাবন থেকে ধর্মশিক্ষা লাভ করে নিজের জন্মভূমি খেতুরে ফিরে আসেন। তিনিই প্রথম এই স্থানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আদর্শ প্রচারের কেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং এখানে মহাসমারোহে উৎসব ও নামসংকীর্তনের প্রচলন করেন। পরবর্তীতে তাঁর তিরোভাব তিথিকে কেন্দ্র করে এই বার্ষিক উৎসবের ঐতিহ্য শুরু হয়।

বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভক্তরা বলেন, নরোত্তম দাস ঠাকুর যখন খেতুরে প্রথম মহোৎসবের আয়োজন করেছিলেন, তখন এটি সমগ্র বাংলা ও ভারতের বৈষ্ণব সমাজে একটি যৃগান্তকারী ঘটনা ছিল। একে সেকালের বৈষ্ণবদের সবচেয়ে বড় মহামিলন ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হয়।

শ্রীশ্রী রাধা-ব্রজমোহন মন্দির, ইসকন খেতুরী ধাম সভাপতি পার্থসারথি কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী এবং প্রভু ব্রহ্মচারী সংকীর্তন রাম দাস বলেন, খেতুরীধামের এই উৎসবের একটি সুন্দর দিক হলো এর চারপাশের স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ও প্রশাসন সবসময় এই উৎসবে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে আসছে। শত শত বছর ধরে এটি বাংলাদেশ ও ভারতের সনাতন ধর্মাবলম্বী, বিশেষ করে বৈষ্ণব ভক্তদের জন্য এক পবিত্র মিলনমেলায় পরিণত হয়ে আছে। ঐতিহাসিক খেতুরীধামে শ্রীশ্রী নরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয়ের তিরোভাব তিথি মহোৎসব।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ১৪৪ ধারা জারি, কক্সবাজারের ইনানীতে হচ্ছেটা কী?

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন