জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারে ভর্তুকি দেওয়ার আহ্বান

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০২৬-এ ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা কমছে। এ পরিস্থিতিতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারে ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি এর প্রসারে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা।

আজ সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সুস্থ মাটি, ফসল ও পরিবেশের জন্য জৈব সার উৎপাদনকে উৎসাহিত করা এবং ভর্তুকি প্রদান’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একশনএইড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (বারি) ২০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

জৈব সার উৎপাদন, নিবন্ধন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা এবং ভর্তুকি প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এতে কৃষি খাতের বিশেষজ্ঞ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, কৃষক এবং জৈব সার উদ্যোক্তারা অংশ নেন।

বৈঠকে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক ও উদ্যোক্তারা জৈব সার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, জৈব সার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়। এ ছাড়া সারের মান যাচাই ও পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বাজারে মানসম্মত জৈব সার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, জৈব সার ব্যবহারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফসলের তাৎক্ষণিক উৎপাদন রাসায়নিক সারের তুলনায় কম হতে পারে। তবে মাটির স্বাস্থ্য ও ফসলের গুণগত মান বজায় রাখতে জৈব সারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাসায়নিক সারের ব্যবহার পুরোপুরি বাদ না দিয়ে মাটি ও ফসলের ধরন অনুযায়ী জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথম কারিগরি অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. এম. আব্দুস সালাম। তিনি জৈব সার উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন এবং এ প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত চান।

বৈঠকের আলোচনায় জৈব সার উৎপাদনের কাঁচামালের প্রাপ্যতা ও বৈচিত্র্য, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সারের প্রয়োগমাত্রা নির্ধারণ এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলো উঠে আসে। পাশাপাশি, কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং জৈব সারের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।

বৈঠকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মোছা. সাবিরা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘একজন মাকে সুস্থ রাখতে পারলে যেমন সুস্থ সন্তানের জন্ম নিশ্চিত করা সম্ভব, তেমনি মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারলে পুষ্টিমানসম্পন্ন ফসল উৎপাদন করা যাবে।’

জৈব সারের মান নিশ্চিত করে বাজারজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরও বলেন, কৃষকদের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে কৃষি কার্ডের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষক নির্বাচন এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

গোলটেবিলের অংশগ্রহণকারীদের জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও কর্মপরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান তিনি। এসব প্রস্তাব তাঁর কাছে পাঠানো হলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানান। কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় কারিগরি অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালক মো. আনোয়ার ফারুক। তিনি জৈব সার উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করতে জেলা পর্যায়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন।

তিনি বলেন, ‘কৃষিব্যবস্থাকে টেকসই করতে প্রাকৃতিক পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। মাটির স্বাস্থ্য ও কাঙ্ক্ষিত পিএইচ (pH) মাত্রা বজায় রাখতে জৈব বালাইনাশক ও জৈব সারের সুষম ব্যবহার জরুরি। তবে কৃষকদের কাছে সময়মতো সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।’

ফসল ও মাটির ধরন অনুযায়ী জৈব সারের প্রয়োগমাত্রা নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরির জন্য গবেষণা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

প্রথম পর্বের সমাপনী বক্তব্যে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এ জন্য জৈব সারের মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণে অনিয়ম দূর করা এবং উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তন আনতে সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও জানান তিনি।

বৈঠকের দ্বিতীয় পর্বে সভাপতিত্ব করেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. আবদুল করিম।

সকালের অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এম. নাজিম উদ্দিন। দ্বিতীয় পর্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান।

আলোচনায় অংশ নেন বারির সাবেক মহাপরিচালক ড. এম. শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. এম. জহির উদ্দিন, বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ড. শাহাবুদ্দিন আহমেদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ এবং গাজীপুরের ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল ট্রেনিং একাডেমির (নাটা) মহাপরিচালক এম. সাইফুল আলম খান।

দিনব্যাপী এ বৈঠকে জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের জন্য ভর্তুকির নীতিমালা প্রণয়ন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং সারের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সুপারিশ উঠে আসে।

পড়ুন : নতুন কুপে গ্যাসের সন্ধান, দৈনিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রত্যাশা

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন