দুর্গাপুরে ১৯ মামলার আসামি ‘শুটার শামীমের’ ভাই বদি জেলে, রিমান্ড আবেদন

সীমান্তবর্তী জনপদ নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দীর্ঘ দুই দশক ধরে অপরাধ জগতের আলোচিত এক নাম বদিউল আলম বদি ওরফে বদিউজ্জামান (৪৭)। অবশেষে আইনের জালে ধরা পড়েছেন হত্যা, বিস্ফোরক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতো দেড় ডজনেরও বেশি মামলার এই আসামি। গত সোমবার (২ নভেম্বর) রাতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে তাকে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে প্রেরণ করেছে দুর্গাপুর থানা-পুলিশ।

তবে মামলার মূল নথি জজ কোর্টে থাকায় এদিন রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং নথি প্রাপ্তি সাপেক্ষে পরবর্তী যেকোনো দিন রিমান্ড আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বদিউল আলম বদির গ্রেফতার কেবল পুরনো মামলার হিসাব-নিকাশেই সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি দুর্গাপুরে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির ওরফে আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যেও তার নাম জোরালোভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে এই হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা হিসেবে তার কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

স্থানীয় রাজনীতি ও অপরাধ জগতের মিশ্র বলয়ে বদিউল আলম বদির অবস্থান। পারিবারিক পরিচয়ে তিনি দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়ালের ছোট ভাই। অন্যদিকে, সাংবাদিক আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন আসামি ও এলাকার আলোচিত সন্ত্রাসী শামীম আহমেদ ওরফে ‘শুটার শামীম’ (৩৬)-এর আপন ভাই তিনি। প্রভাবশালী পারিবারিক পরিচয়ের আড়ালে দুর্গাপুর অঞ্চলে গত ২০ বছর ধরে বদির বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে অপরাধের বিশাল নথি। পিতা আব্দুস সাত্তারের এই পুত্রের বিরুদ্ধে ২০০৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দুর্গাপুর থানায় অন্তত ১৯টি মামলার রেকর্ড (পিসিপিআর) রয়েছে।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ মঙ্গলবার রাতে জানান, আপাতত গত আগস্ট মাসে দায়েরকৃত অপহরণ মামলায় অজ্ঞাতনামা সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে বদিউল আলম বদিকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ আগস্ট রাত আনুমানিক ১০টার দিকে দুর্গাপুরের পশ্চিম খুজিউড়া এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম (৩৫) শিবগঞ্জ বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের কবলে পড়েন। সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় এবং বিজিবি-পুলিশকে তথ্য দেওয়ার সন্দেহে শুটার শামীম ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে শফিকুলের পথরোধ করে। এসময় আসামিরা তার মুখে কাপড় গুঁজে জোরপূর্বক মোটরসাইকেলে তুলে অপহরণ করে পাশের ধোবাউড়া থানার রণসিংহপুর বাজারে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে আটকে রেখে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে ধোবাউড়া থানা-পুলিশের টহল দলের উপস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারীরা শফিকুলকে ফেলে পালিয়ে যায় এবং পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় পরদিন গত ২৫ আগস্ট ভিকটিমের ভাই মো. ফারুক আহমদ বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় শুটার শামীমকে এক নম্বর এবং ইন্তাজ আলীর ছেলে খোকন মিয়াকে (৩০) দুই নম্বর আসামি করে আট জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও সাত-আট জনকে আসামি করা হয়। এই মামলারই তদন্তে প্রাপ্ত সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে বদিকে গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ।

পুলিশের অপরাধ রেকর্ড (পিসিপিআর) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৫ সালের ২ মে দুর্গাপুর থানায় একটি হত্যা মামলার মাধ্যমে পুলিশের খাতায় প্রথম বড় আকারে নাম ওঠে বদির। এরপর ২০১৫, ২০১৮, ২০২১, ২০২২, ২০২৩ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর মামলা দায়ের হয়েছে।

পুলিশের নথিতে থাকা উল্লেখযোগ্য মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ২০০৫ সালের হত্যা মামলার পর সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দায়েরকৃত আরেকটি হত্যা ও সহিংসতা মামলা। এই মামলায় ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ চার্জশিট এবং ২০ জুলাই সম্পূরক চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দায়ের হওয়া বেশ কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, গুরুতর জখম ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি, জুন ও নভেম্বর মাসে দায়েরকৃত একাধিক বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় তার নাম রয়েছে, যার প্রায় সবকটিতেই তদন্ত শেষে ২০২৪ সালে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ (তবে ২০২৩ সালের ২৯ মার্চের একটি বিস্ফোরক মামলায় ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়)।

এর বাইরে ২০১৮ সালের ১১ ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের হওয়া দুটি পৃথক মামলার এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। পাশাপাশি ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ সরকারি কাজে বাধা ও সরকারি কর্মচারীকে আঘাতের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাতেও ২০২৪ সালের ১৫ জুন তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, “বদিউল আলম বদি আগে থেকেই হত্যা ও নাশকতার মতো একাধিক বড় মামলার সাথে জড়িত। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় সে অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা হতে পারে কি না, তার প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে। তাকে অপহরণ মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। জজ কোর্ট থেকে নথি আসলেই রিমান্ড শুনানি হবে। রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও অধিকতর তদন্তে অনেক কর্মকাণ্ডের মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

এদিকে, একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুই দশকে ১৯টি মামলার রেকর্ড এবং অধিকাংশ মামলায় চার্জশিটভুক্ত হওয়ার পরও এতদিন প্রকাশ্যে বাইরে থাকা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন ছিল। বিশেষ করে সাংবাদিক আলিফ ফকিরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে অপরাধীদের শেকড় উপড়ে ফেলার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে দুর্গাপুরবাসীর মধ্যে। বদির গ্রেফতারের খবরে এলাকায় একদিকে যেমন ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনে ফিরেছে স্বস্তি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কেবল গ্রেফতারই নয়, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাংবাদিক হত্যাসহ সীমান্ত জনপদের সকল অপরাধের প্রকৃত কুশীলব ও মদদদাতাদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাস চাপায় ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার চালক-যাত্রী নিহত

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন