চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম খুঁজে দিচ্ছে এআই

শিল্পকর্ম চুরি বিশ্বজুড়েই বড় একটি সমস্যা। মূল্যবান চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন চুরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই ঘটছে। এসব অপরাধের তদন্ত করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। কারণ, চুরি যাওয়া শিল্পকর্মের অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে গোপনে রাখা হয় কিংবা পরিচয় পরিবর্তন করে বিক্রির চেষ্টা করা হয়। তবে এবার এ ধরনের অপরাধ দমনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। বিশেষভাবে তৈরি এআই সফটওয়্যারের মাধ্যমে চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে ইতালির পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের অক্টোবরে ইতালির পারমায় প্রতিবছরের মতো আয়োজন করা হয়েছিল একটি পুরাকীর্তি মেলা। মেলায় নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন পুলিশের কর্মকর্তারা। স্টলগুলোর সামনে দিয়ে হাঁটার সময় তাঁরা বিভিন্ন শিল্পকর্মের ছবি তুলছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারত, কর্মকর্তারা কেবল শিল্পকর্ম দেখতে কিংবা সংগ্রহ করতে আগ্রহী। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের এই কার্যক্রম ছিল একটি বিশেষ তদন্তের অংশ।

মেলায় তোলা ছবিগুলো কর্মকর্তারা পুলিশের অভ্যন্তরীণ ডেটাবেজে আপলোড করেন। এ সময় বিক্রেতাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। মেলায় সাজানো ছিল নানা ধরনের পুরাকীর্তি। কোথাও ছিল মুষ্টির সমান ব্রোঞ্জের মূর্তি, কোথাও পুরোনো রঙের প্রলেপযুক্ত পানপাত্র। পাশাপাশি ছিল হলদে হয়ে যাওয়া গ্লোব, তৈলচিত্র এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন।

তবে ছবিগুলো ডেটাবেজে আপলোড করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশের এআই ব্যবস্থায় একটি ছবির পাশে সতর্কসংকেত দেখা যায়। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছিল ফর্সা ত্বকের এক তরুণীকে। তাঁর পরনে ছিল অ্যাকোয়ামেরিন ও লাল রঙের পোশাক। হাতে ধরা ছিল অর্ধেক খোলা একটি পার্চমেন্টের তৈরি পাণ্ডুলিপি।

সতর্কসংকেত পাওয়ার পরদিনই পুলিশ কর্মকর্তারা দ্রুত মেলায় ফিরে যান এবং ছবিটি জব্দ করেন। পরে শিল্পকর্ম বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সেটি পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা পুলিশ ইউনিটের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালভাতোর রাপিকাভোলি ঘটনাটি সম্পর্কে বলেন, ‘কিছু একটা ঠিক মনে হচ্ছিল না।’

রাপিকাভোলির দল কয়েক দশক ধরে ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম ও ঐতিহাসিক নিদর্শন উদ্ধারে কাজ করছে। তাঁর মতে, নতুন এআই প্রযুক্তি পুলিশের এই দীর্ঘদিনের কাজে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আগে যেসব শিল্পকর্ম শনাক্ত করতে অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় হতো, এখন সেগুলোর সম্ভাব্য মিল খুব দ্রুত খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে। এমনকি শিল্পকর্মের এমন কিছু সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যও প্রযুক্তিটি শনাক্ত করতে পারে, যা সাধারণভাবে মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়ে না।

রাপিকাভোলি বলেন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম শনাক্তের ঘটনা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এআই ব্যবস্থাটি চালুর পর থেকে তাঁর দলকে ৩০০টির বেশি বড় আকারের লুট হওয়া চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য উদ্ধারে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি ছোট আকারের এক লাখ ৬৫ হাজারের বেশি ঐতিহাসিক ও মূল্যবান সামগ্রী শনাক্ত ও উদ্ধারের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে প্রযুক্তিটি।

উদ্ধার হওয়া এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে মুদ্রা, পদক, চিঠি, পাণ্ডুলিপি, ধর্মীয় সামগ্রী, ডাকটিকিট ও বিভিন্ন ধরনের কার্ড। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া শিল্পকর্ম ও সামগ্রীর আনুমানিক মূল্য ২০ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর বেশি।

এআই প্রযুক্তি চালুর আগে চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম খুঁজে বের করতে ইতালির পুলিশকে বেশ সময়সাপেক্ষ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হতো। কর্মকর্তারা নিয়মিত শিল্পকর্ম মেলা, পুরোনো জিনিসপত্রের দোকান এবং অভিজাত শিল্পকর্মের নিলামে যেতেন। সেখানে প্রদর্শিত বিভিন্ন শিল্পকর্মের সঙ্গে পুলিশের সংরক্ষণে থাকা চুরি যাওয়া সামগ্রীর তথ্য ও ছবি মিলিয়ে দেখতেন।

প্রথম দিকে এসব তথ্য কাগজে সংরক্ষণ করা হতো। পরবর্তী সময়ে সেগুলো ডিজিটাল করে অনলাইন ডেটাবেজে রাখা হয়। কিন্তু ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি হলেও অনুসন্ধানের কাজ পুরোপুরি সহজ হয়নি। কারণ, কোনো একটি শিল্পকর্মের সম্ভাব্য পরিচয় নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের একটির পর একটি রেকর্ড পরীক্ষা করতে হতো।

কোনো শিল্পকর্ম বিক্রির সময় সন্দেহ তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ডেটাবেজে থাকা শত শত ছবি ঘেঁটে সম্ভাব্য মিল খুঁজে বের করতে হতো। এ ধরনের কাজে অনেক সময় প্রয়োজন হতো। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বৈশিষ্ট্য বা সূক্ষ্ম বিবরণ চোখ এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকত। তার ওপর পুরোনো ডেটাবেজে সংরক্ষিত অনেক শিল্পকর্মের ছবির মান ছিল বেশ খারাপ। ফলে একই শিল্পকর্মের সঙ্গে মিল থাকা সত্ত্বেও সেটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ত।

নতুন এআই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শিল্পকর্মের দৃশ্যগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে পারে। শুধু ছবির সামগ্রিক অবয়ব নয়, বরং রঙের বিভিন্ন স্তর, নকশা, আকৃতি এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও মিল খুঁজে বের করতে সক্ষম প্রযুক্তিটি।

কোনো মেলা, দোকান কিংবা নিলামে পাওয়া শিল্পকর্মের ছবি ডেটাবেজে আপলোড করা হলে এআই সেটি আগে থেকে সংরক্ষিত চুরি যাওয়া শিল্পকর্মের ছবির সঙ্গে তুলনা করে। এরপর সম্ভাব্য মিল পাওয়া গেলে পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক করে। এতে কর্মকর্তারা দ্রুত সন্দেহজনক শিল্পকর্মের বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে পারেন।

এআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া মিল অবশ্যই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। কোনো শিল্পকর্ম আসলেই চুরি যাওয়া নিদর্শন কি না, তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা এবং পুলিশের তদন্ত প্রয়োজন হয়। তবে সম্ভাব্য মিল দ্রুত শনাক্ত করার কারণে তদন্তের প্রাথমিক ধাপ অনেক সহজ হয়ে উঠছে।

ইতালির এই উদ্যোগ শিল্পকর্ম চুরি প্রতিরোধ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। দেশটির অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বিশ্বের অন্যান্য দেশও শিল্পকর্ম চুরির তদন্তে মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রযুক্তিটি শুধু চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম খুঁজে পেতেই সহায়তা করছে না, বরং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজেও নতুন গতি আনছে। ফলে ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি শিল্পকর্ম পাচার ও চুরির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

পড়ুন:দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা সেতু ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন