ওয়েসিস বিয়াম স্কুলে ৫টি সহশিক্ষা ক্লাবের উদ্বোধন করলেন জেলা প্রশাসক

চোখে মুখে রাজ্যের কৌতূহল আর বুকভরা আত্মবিশ্বাস। কারও সামনে সাজানো আগ্নেয়গিরির মডেল থেকে বেরিয়ে আসছে লাভা, কেউবা তৈরি করেছে পানি বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার কিংবা মহাকাশে ডানা মেলার রকেট। আবার পাশের কক্ষেই চলছে সাবলীল ইংরেজিতে যুক্তি-তর্কের লড়াই ও বক্তব্য উপস্থাপন। মাঠের সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে একদল খুদে শিক্ষার্থী প্রদর্শন করছে আত্মরক্ষার কৌশল কারাতে (মার্শাল আর্ট)।

কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ নয়, এই চিত্রটি নেত্রকোনা পৌরশহরের ‘ওয়েসিস বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল’-এর খুদে ও প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের। পুঁথিগত বিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে শৈশবেই শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে বিদ্যালয়টিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে পাঁচটি সহশিক্ষা কার্যক্রম ক্লাব।

নেত্রকোনা জেলায় এর আগে প্রায় চল্লিশটিরও বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ ধরনের ক্লাব চালু করা হলেও, প্রাথমিক ও খুদে শিক্ষার্থীদের পর্যায়ে এমন উদ্যোগ এটিই প্রথম। ফিতা কেটে ব্যতিক্রমী আয়োজনের শুভ উদ্বোধন করেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি এবং রাজস্ব) মুন মুন জাহান লিজাসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকবৃন্দ।

শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে শৈশব থেকেই সঠিক খাতে প্রবাহিত করতে যে পাঁচটি ক্লাব উদ্বোধন করা হয়েছে সেগুলো হলো- ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, কালচারাল ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব এবং স্পোর্টস ক্লাব।

উদ্বোধনের দিন দুপুর ১২টায় জেলা প্রশাসক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছালে খুদে শিক্ষার্থীরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে এবং স্কাউট দলের চৌকস অভিবাদনের মাধ্যমে তাকে বরণ করে নেয়। উদ্বোধনের পর অতিথিরা প্রতিটি ক্লাবের কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং খুদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটান।

বিজ্ঞান ক্লাবের প্রদর্শনী কক্ষে প্রবেশ করতেই এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রচলিত ভীতিকে জয় করে অতি অল্প বয়সী শিক্ষার্থীরা অতিথিদের সামনে ইংরেজিতে তাদের তৈরি বিভিন্ন প্রজেক্টের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে।

বিদ্যালয়ের খুদে শিক্ষার্থী রাফিয়া দানিন মুনম রংধনুর চমৎকার একটি মডেল প্রদর্শন করে অত্যন্ত সাবলীল ইংরেজিতে বর্ণনা করে, কীভাবে বৃষ্টির পর আকাশে সূর্যের আলো ফোঁটার মধ্য দিয়ে প্রতিসরিত হয়ে সাতটি রঙের (লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, আসমানী ও বেগুনি) অপরূপ রংধনু তৈরি করে।

এছাড়াও অন্য শিক্ষার্থীরা পৃথিবীর গঠনস্তর , পানি চক্র , বায়ুকল, পানি বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের জীবন্ত মডেল প্রদর্শন করে। অন্যদিকে ল্যাঙ্গুয়েজ ও বিতর্ক ক্লাবে খুদে বিতার্কিকরা জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সমাজের নানা দিক নিয়ে ইংরেজিতে বক্তব্য এবং মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধ নিয়ে আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করে।

স্পোর্টস ক্লাবের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজন করা হয় মার্শাল আর্ট বা কারাতে প্রদর্শনী। প্রশিক্ষকের নির্দেশনায় খুদে ছেলেমেয়েরা আত্মরক্ষার বিভিন্ন কৌশল প্রদর্শন করে। প্রদর্শনী শেষে জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান, এই প্রশিক্ষণ তাদের কী কাজে লাগবে? জবাবে খুদে শিক্ষার্থী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানায়, কোনো দুষ্টু লোক বা বিপদ সামনে এলে তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে এবং অন্যকেও সাহায্য করতে পারবে। শিশুদের এমন সচেতন ও সাহসী উত্তরে উপস্থিত সকলের মাঝে করতালির রোল পড়ে যায়।

উদ্বোধন ও পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‍‍“আমাদের এই ক্লাবগুলো উদ্বোধনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাচ্চারা যেন পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের সৃজনশীল মননকে বিকশিত করতে পারে। সহশিক্ষা কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে তারা যেন সব মিলিয়ে একজন স্মার্ট স্টুডেন্ট এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটিজেন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।”

প্রাথমিক পর্যায়ে এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “ওরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং একবিংশ শতাব্দীর বাসিন্দা। প্রযুক্তি-সচেতন প্রজন্মকে আমরা কীভাবে গঠনমূলক ও সৃজনশীল কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে পারি, এটি তারই একটি প্রচেষ্টা। এর আগে আমরা জেলার ৪০টিরও বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসব ক্লাবগুলো চালু করেছি। পর্যায়ক্রমে সারা জেলায় এটি ছড়িয়ে দেওয়া হবে এবং আমরা আশা করছি আমাদের এই মডেলটি দেশের অন্যান্য জায়গাতেও সমাদৃত হবে।”

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি এবং রাজস্ব) মুন মুন জাহান লিজা বলেন, “ওয়েসিস বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলটি সরাসরি জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং বিয়াম ফাউন্ডেশন ঢাকা থেকে এটি মনিটরিং করা হয়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ের এই যাত্রাটি আমরা আমাদের নিজেদের স্কুল দিয়েই শুরু করলাম। আজ বাচ্চারা পাঁচটি ক্লাবের অধীনে তাদের অসাধারণ প্রতিভা প্রদর্শন করেছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের শ্রদ্ধেয় জেলা প্রশাসক স্যারের এই উদ্ভাবনী চিন্তাটি আমরা পরবর্তীতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সহযোগিতায় নেত্রকোনার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে দেব। আমরা বিশ্বাস করি, নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের এই মডেলটি সারা বাংলাদেশে অনুসরণ করা হবে এবং প্রাথমিক শিক্ষায় সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদারে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।”

অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মহল মনে করছেন, শৈশবেই শুধু মুখস্থ বিদ্যার চাপ না দিয়ে এ ধরনের আনন্দময় ও সৃজনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শিশুরা যেমন স্কুলমুখী হবে, তেমনি তাদের মানসিক ও মানবিক বিকাশও পূর্ণতা পাবে। নেত্রকোনার এই উদ্যোগ দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : মাগুরায় লুটকৃত স্বর্ণের বার ভাগাভাগি নিয়েই খুন হয় যুবদল নেতা শাকের

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন